গৌরীপুরে আগুনে পুড়ল শত বছরের ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ ও সিনেমা হল
- আপডেট সময় : ০৫:১৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ এবং ‘ঝলমল সিনেমা হল’ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সোয়া দুইটার দিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে সিনেমা হলের আশপাশে থাকা ১৫ থেকে ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেকোরেশন সামগ্রীর দোকান, পুরোনো কাপড়ের দোকান এবং একটি এলপিজি সিলিন্ডারের গুদাম।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গভীর রাতে হঠাৎ সিনেমা হলের দিক থেকে আগুনের শিখা ও কয়েক দফা বিকট শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চের কাঠের কাঠামোসহ আশপাশের দোকানপাটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ময়মনসিংহ ও স্থানীয় ইউনিটের মোট চারটি দল ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর রাত ৩টা ৪০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে একটি এলপিজি সিলিন্ডারের গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে তদন্ত শেষেই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, এই অগ্নিকাণ্ডে তাদের মিলিতভাবে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। টিএ টিম্বার তাজ ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী তাহাজ উদ্দিন ভুট্টো জানান, আগুনে তার ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ১১টি মেশিন এবং প্রায় ৬০ লাখ টাকার কাঠ পুড়ে গেছে। গ্যাসের ডিলার জামাল উদ্দিন জানান, রাতে গ্যাসের প্রায় ২৫০টি বোতল নামিয়ে বাড়ি যাওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিট পরেই তিনি আগুন লাগার খবর পান। আগুনে তার সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।
ঐতিহাসিক এই নাট্যমঞ্চটির রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে গৌরীপুর রাজপরিবারের বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর উদ্যোগে এটি নির্মিত হয়েছিল। কলকাতায় অবস্থানকালে ঐতিহ্যবাহী ‘স্টার থিয়েটার’-এর স্থাপত্যশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে তিনি গৌরীপুরে কাঠের এই নান্দনিক কাঠামোটি গড়ে তোলেন। ‘শাহজাহান’ নাটকের মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে এর সাংস্কৃতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। কালক্রমে এটি দেশ-বিদেশের শিল্পী ও নাট্যকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে।
এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এটি কেবল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়ে যাওয়া নয়, বরং গৌরীপুরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি। স্থানীয়রা ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, তা বের করতে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের দাবি তুলেছেন তারা। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরাও সরকারি সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিয়া আমীন পাপ্পা জানান, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে লিজে ছিল। প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় না থাকায় লিজ গ্রহীতাকে নোটিশ দেওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন লিজসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।





























