ঢাকা ১০:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মাইক্রোসফটসহ ৮ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের গ্রিন কার্ড স্থগিত, তদন্তে ৯ বিশ্ববিদ্যালয় সৌদির হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাবে না তুরস্ক সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার হবে ডিজিটাল যুগেও ফুরিয়ে যায়নি কয়রার ডাকসেবার গুরুত্ব মাটির ঘরে তৈলার দ্বীপ ডাকঘর, বাক্স খুললেও মেলে না চিঠি শিবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযান, ভারতীয় মদ ও নেশাজাতীয় সিরাপ জব্দ রাজধানীর মহাখালীতে এসি বাসে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ১৬ মিনিট হরমুজ প্রণালিতে শক্তিশালী বিস্ফোরণ, কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা রামেবি উপাচার্যকে লাঞ্ছনাকারীরা রাষ্ট্র ও জনগণের শত্রু: ভূমিমন্ত্রী কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে একরাতে আটক আরও ২৫২ জন

৭ অক্টোবরের পর বদলে যাওয়া গাজা: সিনওয়ারের সিদ্ধান্ত ও জনমত

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৬:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি এবং হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ভূমিকা নিয়ে জনমতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এই হামলার ১৮ মাস আগে, ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল, সিনওয়ার সতর্ক করেছিলেন যে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ ও জেরুজালেমে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে একটি বড় ধরনের ‘আঞ্চলিক ধর্মীয় যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে। তিনি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও তাদের সশস্ত্র শাখাগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন।

৭ অক্টোবরের হামলার পরিকল্পনা সিনওয়ার তখনই করেছিলেন কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে ওই বক্তব্যে তিনি ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি এবং গাজার অবরোধ পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলিদের উদ্দেশে দেওয়া আরেক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, তারা ‘বন্যার মতো’ আসবেন, থাকবে অসংখ্য রকেট এবং যোদ্ধাদের একের পর এক ঢেউ।

ইসরায়েলি সাংবাদিক শ্লোমি এলদার ও রুথ ইউভালের গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৭ অক্টোবরের হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে সিনওয়ার ফাতাহর এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইসরায়েলকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের এই তথ্য ‘হোস্টেজেস: ৮৪৩ ডেজ অব অ্যাব্যান্ডনমেন্ট’ বইয়েও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লেখকদের দাবি, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বন্দিবিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তির একটি চুক্তি প্রায় প্রস্তুত ছিল, কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এর অনুমোদন পিছিয়ে দেন। এরপর সিনওয়ার হামলার সিদ্ধান্ত নেন বলে ওই অনুসন্ধানে বলা হয়েছে। এর আগে তিনি ইসরায়েল সরকারকে ‘ভূমিকম্প’ ঘটাতে পারে এমন প্রতিক্রিয়ার সতর্কতা দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে আলোচনায় যুক্ত দলের সঙ্গে সিনওয়ারের যোগাযোগ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ইসরায়েলের শিন বেতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, ‘তিনি আমাদের রাডার থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।’ এর পরই ৭ অক্টোবর হামাস হামলা চালায়।

হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যার ফলে বিমান হামলা ও অন্যান্য সামরিক অভিযান চালানো হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইসমাইল হানিয়েহ নিহত হন। হানিয়েহর উত্তরসূরি হিসেবে সিনওয়ারকে বেছে নেয় হামাস। হামাসের এক সূত্র জানায়, এই সিদ্ধান্ত ছিল সিনওয়ারের জনপ্রিয়তা এবং তার রাজনৈতিক পথের প্রতি সংগঠনের নেতৃত্বের আস্থার প্রকাশ। ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যেও গাজায় হামাসের সশস্ত্র শাখা আল-কাসাম ব্রিগেড ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিনওয়ার নিহত হন, যা একটি অপ্রত্যাশিত সংঘর্ষে ঘটেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিনওয়ারের মৃত্যুর পরও গাজায় যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকে। জাতিসংঘের কমিশনগুলো ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে ‘গণহত্যা’ শব্দ ব্যবহার করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ৮২ শতাংশ ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার এবং পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৭১ বিলিয়ন ডলার। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিই গাজায় সিনওয়ারকে ঘিরে জনমত বদলের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পরও গাজার মানুষের মধ্যে সিনওয়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হামাসের সমর্থকদের মধ্যেও তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। ভিডিও, প্রত্যক্ষ বর্ণনা এবং স্থানীয় আলোচনায় এ নিয়ে ক্ষোভের কথা উঠে এসেছে। হামাসের এক সূত্র অবশ্য এই সমালোচনাকে অন্যায্য বলে মনে করেন। আশরাক আল-আওসাতকে তিনি বলেন, সিনওয়ারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যে অপমান ও কঠোর সমালোচনা হয়েছে, তা ন্যায্য নয়। তার মতে, গাজায় দীর্ঘদিনের অবরোধ ও ইসরায়েলি হামলার বাস্তবতা সবাইকে অনুভব করানোর লক্ষ্যেই সিনওয়ার ওই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনি নীতি ও জনমত গবেষণা কেন্দ্রের জরিপগুলোতে ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতি জনসমর্থন কমে আসার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ সালের মার্চের জরিপে পশ্চিম তীরে হামলার সমর্থন ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছিল। একই সময়ে গাজায় সমর্থন প্রায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছিল। ওই জরিপে সমর্থন বাড়ার একটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, অনেক ফিলিস্তিনি মনে করেন ৭ অক্টোবরের হামলা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুকে আবার আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। গত আগস্টে জেরুজালেম মিডিয়া ও যোগাযোগ কেন্দ্র এবং ফ্রিডরিখ এবার্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ জরিপেও হামাসের প্রতি আস্থার পতনের চিত্র পাওয়া যায়। হামাসের ওপর আস্থা রাখা মানুষের হার ২০২২ সালের জুনের ১২ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।

৭ অক্টোবরের তিন বছর পর হামাসের চারটি সূত্র বলেছে, ওই হামলার কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা হয়নি। নেতাদের কেউ হামলার সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেননি। তাদের বক্তব্য, হামাসের অনেক নেতা হামলার বিষয়ে কিছু জানতেন না। কেউ কেউ কম-বেশি জানতেন। কিন্তু হামলার পর তাদের অবস্থানে পরিবর্তন আসেনি। গাজার বাইরে থাকা হামাসের আরেক সূত্র অবশ্য জানিয়েছেন, সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ব্যক্তিগত বৈঠকে মাঝেমধ্যে সমালোচনা হয়েছে। তবে তা হামলার মূল সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল না। আলোচনার পদ্ধতি, হামলার ব্যাপ্তি এবং ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া যথাযথভাবে অনুমান করতে না পারার মতো বিষয় নিয়ে মতভেদ ছিল।

ওই সূত্রের মতে, ধ্বংসের পরও ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনের বিষয়টি আবার আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা ইব্রাহিম অবশ্য স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, সিনওয়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে গাজায় এখনো প্রকাশ্য সমালোচনা ও ক্ষোভ রয়েছে। কারণ সিদ্ধান্তটির পর যে ধ্বংস, প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারানোর ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে গাজার মানুষকেই। ইব্রাহিম বলেন, গাজার বাইরে থাকা ফিলিস্তিনি বা অন্যরা সিনওয়ারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু তারা গাজার মানুষের মতো ধ্বংস, হত্যাকাণ্ড, বাস্তুচ্যুতি ও ঘরবাড়ি হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি। গাজায় তাই সিনওয়ারকে নিয়ে আলোচনা এখন শুধু ৭ অক্টোবরের হামলার সিদ্ধান্তকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি। ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি, বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং যুদ্ধের দীর্ঘ ক্ষয়ক্ষতি—সবকিছু মিলিয়ে তার সিদ্ধান্তকে নতুন করে দেখছেন গাজার অনেক মানুষ।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

৭ অক্টোবরের পর বদলে যাওয়া গাজা: সিনওয়ারের সিদ্ধান্ত ও জনমত

আপডেট সময় : ০৬:৪৬:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি এবং হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ভূমিকা নিয়ে জনমতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এই হামলার ১৮ মাস আগে, ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল, সিনওয়ার সতর্ক করেছিলেন যে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ ও জেরুজালেমে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে একটি বড় ধরনের ‘আঞ্চলিক ধর্মীয় যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে। তিনি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও তাদের সশস্ত্র শাখাগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন।

৭ অক্টোবরের হামলার পরিকল্পনা সিনওয়ার তখনই করেছিলেন কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে ওই বক্তব্যে তিনি ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি এবং গাজার অবরোধ পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলিদের উদ্দেশে দেওয়া আরেক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, তারা ‘বন্যার মতো’ আসবেন, থাকবে অসংখ্য রকেট এবং যোদ্ধাদের একের পর এক ঢেউ।

ইসরায়েলি সাংবাদিক শ্লোমি এলদার ও রুথ ইউভালের গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৭ অক্টোবরের হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে সিনওয়ার ফাতাহর এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইসরায়েলকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের এই তথ্য ‘হোস্টেজেস: ৮৪৩ ডেজ অব অ্যাব্যান্ডনমেন্ট’ বইয়েও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লেখকদের দাবি, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বন্দিবিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তির একটি চুক্তি প্রায় প্রস্তুত ছিল, কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এর অনুমোদন পিছিয়ে দেন। এরপর সিনওয়ার হামলার সিদ্ধান্ত নেন বলে ওই অনুসন্ধানে বলা হয়েছে। এর আগে তিনি ইসরায়েল সরকারকে ‘ভূমিকম্প’ ঘটাতে পারে এমন প্রতিক্রিয়ার সতর্কতা দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে আলোচনায় যুক্ত দলের সঙ্গে সিনওয়ারের যোগাযোগ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ইসরায়েলের শিন বেতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, ‘তিনি আমাদের রাডার থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।’ এর পরই ৭ অক্টোবর হামাস হামলা চালায়।

হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যার ফলে বিমান হামলা ও অন্যান্য সামরিক অভিযান চালানো হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইসমাইল হানিয়েহ নিহত হন। হানিয়েহর উত্তরসূরি হিসেবে সিনওয়ারকে বেছে নেয় হামাস। হামাসের এক সূত্র জানায়, এই সিদ্ধান্ত ছিল সিনওয়ারের জনপ্রিয়তা এবং তার রাজনৈতিক পথের প্রতি সংগঠনের নেতৃত্বের আস্থার প্রকাশ। ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যেও গাজায় হামাসের সশস্ত্র শাখা আল-কাসাম ব্রিগেড ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিনওয়ার নিহত হন, যা একটি অপ্রত্যাশিত সংঘর্ষে ঘটেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিনওয়ারের মৃত্যুর পরও গাজায় যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকে। জাতিসংঘের কমিশনগুলো ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে ‘গণহত্যা’ শব্দ ব্যবহার করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ৮২ শতাংশ ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার এবং পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৭১ বিলিয়ন ডলার। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিই গাজায় সিনওয়ারকে ঘিরে জনমত বদলের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পরও গাজার মানুষের মধ্যে সিনওয়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হামাসের সমর্থকদের মধ্যেও তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। ভিডিও, প্রত্যক্ষ বর্ণনা এবং স্থানীয় আলোচনায় এ নিয়ে ক্ষোভের কথা উঠে এসেছে। হামাসের এক সূত্র অবশ্য এই সমালোচনাকে অন্যায্য বলে মনে করেন। আশরাক আল-আওসাতকে তিনি বলেন, সিনওয়ারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যে অপমান ও কঠোর সমালোচনা হয়েছে, তা ন্যায্য নয়। তার মতে, গাজায় দীর্ঘদিনের অবরোধ ও ইসরায়েলি হামলার বাস্তবতা সবাইকে অনুভব করানোর লক্ষ্যেই সিনওয়ার ওই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনি নীতি ও জনমত গবেষণা কেন্দ্রের জরিপগুলোতে ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতি জনসমর্থন কমে আসার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ সালের মার্চের জরিপে পশ্চিম তীরে হামলার সমর্থন ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছিল। একই সময়ে গাজায় সমর্থন প্রায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছিল। ওই জরিপে সমর্থন বাড়ার একটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, অনেক ফিলিস্তিনি মনে করেন ৭ অক্টোবরের হামলা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুকে আবার আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। গত আগস্টে জেরুজালেম মিডিয়া ও যোগাযোগ কেন্দ্র এবং ফ্রিডরিখ এবার্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ জরিপেও হামাসের প্রতি আস্থার পতনের চিত্র পাওয়া যায়। হামাসের ওপর আস্থা রাখা মানুষের হার ২০২২ সালের জুনের ১২ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।

৭ অক্টোবরের তিন বছর পর হামাসের চারটি সূত্র বলেছে, ওই হামলার কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা হয়নি। নেতাদের কেউ হামলার সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেননি। তাদের বক্তব্য, হামাসের অনেক নেতা হামলার বিষয়ে কিছু জানতেন না। কেউ কেউ কম-বেশি জানতেন। কিন্তু হামলার পর তাদের অবস্থানে পরিবর্তন আসেনি। গাজার বাইরে থাকা হামাসের আরেক সূত্র অবশ্য জানিয়েছেন, সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ব্যক্তিগত বৈঠকে মাঝেমধ্যে সমালোচনা হয়েছে। তবে তা হামলার মূল সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল না। আলোচনার পদ্ধতি, হামলার ব্যাপ্তি এবং ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া যথাযথভাবে অনুমান করতে না পারার মতো বিষয় নিয়ে মতভেদ ছিল।

ওই সূত্রের মতে, ধ্বংসের পরও ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনের বিষয়টি আবার আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা ইব্রাহিম অবশ্য স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, সিনওয়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে গাজায় এখনো প্রকাশ্য সমালোচনা ও ক্ষোভ রয়েছে। কারণ সিদ্ধান্তটির পর যে ধ্বংস, প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারানোর ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে গাজার মানুষকেই। ইব্রাহিম বলেন, গাজার বাইরে থাকা ফিলিস্তিনি বা অন্যরা সিনওয়ারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু তারা গাজার মানুষের মতো ধ্বংস, হত্যাকাণ্ড, বাস্তুচ্যুতি ও ঘরবাড়ি হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি। গাজায় তাই সিনওয়ারকে নিয়ে আলোচনা এখন শুধু ৭ অক্টোবরের হামলার সিদ্ধান্তকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি। ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি, বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং যুদ্ধের দীর্ঘ ক্ষয়ক্ষতি—সবকিছু মিলিয়ে তার সিদ্ধান্তকে নতুন করে দেখছেন গাজার অনেক মানুষ।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin