১৯ বছরের ব্যবসা বন্ধ, ব্যাংকঋণহীন এক পোশাকমালিকের করুণ বিদায়
- আপডেট সময় : ০৮:৫২:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

কোনো ধরনের ব্যাংকঋণ ছাড়াই দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে তিলে তিলে একটি ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন উদ্যোক্তা মাহবুবুল হাসান ফয়সাল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী এলাকায় অবস্থিত তাঁর রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট এই কারখানাটিতে ১৭৭ জন শ্রমিকসহ মোট ১৯০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। অথচ গত বছরও এই কারখানা থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২০ কোটি টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি করা হয়েছিল।
কারখানাটি বন্ধের পর গত শুক্রবার নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সদস্যদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটি আবেগঘন বার্তা দেন ম্যাট্রিক্স ড্রেসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুবুল হাসান ফয়সাল। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমি নানান উপায়ে চেষ্টা করেছি, প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার। কিন্তু সফল হতে পারলাম না। শুধু ব্যবসায়িক মন্দার জন্যই না, কিছু মানুষের স্বার্থান্বেষী চেষ্টাতেও প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছি।’ তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, তিনি যেন ফ্যাক্টরির একটি সুব্যবস্থা করে সমস্ত পাওনাদারের পাওনা পরিশোধের মাধ্যমে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
উদ্যোক্তা হিসেবে মাহবুবুল হাসানের পথচলা শুরু হয়েছিল অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে। ২০০৬ সালে আরও পাঁচজন অংশীদারকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুরে ম্যাট্রিক্স স্টাইল নামে একটি পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শুরুতে সাব-কন্ট্রাক্টিং করলেও পরের বছরই সরাসরি রপ্তানি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে অংশীদারদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় আড়াই বছরের মাথায় সেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে তিনি আড়াই বছর ট্রেডিং ব্যবসা এবং দুই অংশীদারকে নিয়ে একটি স্কিন প্রিন্টের কারখানা চালিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ২০০৯ সালে একই এলাকায় ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস নামে নতুন করে যাত্রা শুরু করেন মাহবুবুল হাসান। আগের ব্যবসা থেকে পাওয়া ২৬ লাখ টাকা দিয়ে পুরোনো মেশিন কিনেছিলেন তিনি। তবে আবাসিক ভবনে কারখানা হওয়ায় প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পাচ্ছিলেন না। বাধ্য হয়ে অন্য দুটি কারখানার নামে ঋণপত্র (এলসি) খুলে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানি করেন। কিন্তু রপ্তানির অর্থ আসার পর ওই কারখানাগুলো তাঁর পাওনা আটকে দেয়। এরপর আরেকটি কারখানার নামে ক্রয়াদেশ এনে কাজ করলেও সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক রপ্তানি প্রণোদনার অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে শুরুতেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি।
ধাক্কা সামলে ২০১১ সালে মিরপুরের রূপনগরে একটি কমার্শিয়াল শেড ভাড়া নিয়ে কারখানা স্থানান্তর করেন মাহবুবুল হাসান। ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স সংগ্রহ করে নিজের নামেই সরাসরি রপ্তানি শুরু করেন। নিয়মিত ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসতে থাকায় ব্যবসাও বড় হতে থাকে। তবে রানা প্লাজা ধসের পর নিরাপদ কারখানার বিষয়ে কড়াকড়ি শুরু হলে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী নির্মিত না হওয়ায় ম্যাট্রিক্স ড্রেসেসের ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।
বাধ্য হয়ে ২০২২ সালের শেষ দিকে মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের পেছনে একটি ভাড়া করা শেডে কারখানাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই ২০২৩ সালে ৪১ লাখ ডলার বা প্রায় ৪৪ কোটি ২৮ লাখ টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। তখন ফ্রান্স, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, হল্যান্ড, জার্মানি, স্পেন ও ইতালির ১০ থেকে ১১টি নামী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাজ করত ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস।
তবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের পর পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে যায়। ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা করার পর উৎপাদন ব্যয় একলাফে অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু ক্রেতারা পোশাকের বাড়তি মূল্য দিতে রাজি হয়নি; উল্টো পুরোনো একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় গ্যাস-সংকট, যার কারণে ডায়িং খরচ অনেক বেড়ে যায়। আবার মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কিছু ক্রেতা লিড টাইম কমিয়ে দেয়। এরই মধ্যে আবার মজুরি বাড়ে আরও ৯ শতাংশ। একের পর এক ব্যয় বাড়লেও ক্রেতারা পোশাকের দাম না বাড়িয়ে উল্টো কমিয়ে দেয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় তুলতে না পেরে অনেক ক্রয়াদেশ ছেড়ে দিতে হয়। অন্যদিকে ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে সময়মতো ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা সম্ভব হয়নি, যার ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হয়।
এই বহুমুখী সংকটে পড়ে ২০২৪ সালে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেসের রপ্তানি নেমে আসে সাড়ে ২০ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের প্রায় অর্ধেক। গত বছর তা আরও কমে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ডলারে। চলতি বছর ক্রয়াদেশের তীব্র সংকটে পড়ে কয়েক মাস ধরে কারখানাটিতে কেবল সাব–কন্ট্রাক্টিংয়ের কাজ চলছিল। কিন্তু সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের আয় দিয়ে কারখানার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। গত সাত-আট মাস ধরে শ্রমিকদের বেতন দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে এবং প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। কারখানার ভাড়াও বকেয়া পড়েছে টানা ৯ মাস। পরিস্থিতি সামলাতে নিজের একটি ফ্ল্যাট পর্যন্ত ব্যাংকে বন্ধক রাখতে হয়েছে ফয়সালকে।
চরম হতাশা প্রকাশ করে মাহবুবুল হাসান ফয়সাল বলেন, ‘ব্যবসা করতে গিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা এখন আমার ঘাড়ে। কীভাবে এই দায় থেকে বের হব, বুঝতে পারছি না। ১৯ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা কারখানাটি বিক্রির চেষ্টা করছি, যাতে এটি কারও না কারও হাত ধরে বেঁচে থাকে। সেটি হলেও কিছুটা সান্ত্বনা পাব।’





























