মিয়ানমারে পণ্য রপ্তানির অর্থ আসবে তৃতীয় দেশ থেকে, ছাড় দিচ্ছে এনবিআর
- আপডেট সময় : ১০:১৭:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে

যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। তবে প্রতিবেশী দেশটির চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও তীব্র ডলার-সংকটের কারণে সেখানকার ব্যবসায়ীরা সরাসরি আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন না। এই জটিলতা এড়াতে তাঁরা তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের দাম পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছেন। বাংলাদেশের একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে আবেদন করেছে, যা শিগগিরই অনুমোদন পেতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত জুলাই মাসে ‘এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুড’ নামের একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান তৃতীয় কোনো দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য আনার অনুমতি চেয়ে এনবিআরে আবেদন করে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে আলু, সিমেন্ট ও ওষুধ আমদানি করতে অত্যন্ত আগ্রহী। কিন্তু দেশটিতে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ডলারের ঘাটতির কারণে তাঁরা সরাসরি অর্থ পাঠাতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড কিংবা দুবাই থেকে বাংলাদেশি পণ্যের মূল্য পরিশোধ করতে চান। সাধারণত টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়েই মিয়ানমারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবেদনটি পাওয়ার পর তাঁরা নিজেরা বিষয়টি পর্যালোচনা করেছেন এবং ব্যাংক খাতের অংশীজনদের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। যেহেতু মূল লক্ষ্য রপ্তানি বাণিজ্যকে সহজ ও গতিশীল করা, তাই আবেদনটি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তৃতীয় দেশ থেকে রপ্তানি আয় আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো আইনি বাধা নেই। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনেও ভিন্ন কোনো দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য পরিশোধের এই সুযোগ রাখা হয়েছিল।
তবে অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক চিঠি এখনও টেকনাফ শুল্ক স্টেশনে পৌঁছায়নি। ফলে অপেক্ষায় থাকা এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুডের মালিক এম ডি আলম কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এমন একটি ভালো সুযোগের জন্যও দীর্ঘ সময় ঘুরতে ও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, মিয়ানমারে সিমেন্টের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ও অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে রপ্তানির পুরো সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সিমেন্টের পাশাপাশি দেশি আলু এবং বিভিন্ন ধরনের এনার্জি ড্রিংকস রপ্তানিরও বড় সুযোগ রয়েছে সেখানে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশ ৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। রপ্তানি হওয়া প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, আলু, ইয়ার্ন ও পাটজাত পণ্য।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এস এম নুরুল হক এই উদ্যোগের বিষয়ে বলেন, যুদ্ধের কারণে মিয়ানমারে ডলার-সংকটের পাশাপাশি তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। আগে সেখানে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা সচল থাকলেও এখন সেটি আর নেই। তবে মিয়ানমারের অনেক বিত্তশালী ব্যবসায়ী বর্তমানে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা সেসব দেশ থেকে সহজেই বিল পরিশোধ করতে পারেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মিয়ানমারের বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ অত্যন্ত জনপ্রিয়।
অবশ্য সিমেন্ট রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন সতর্কতার কথা জানিয়েছেন কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মুর্শেদ। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সিমেন্ট রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছুটা কড়াকড়ি রয়েছে। কারণ, এই সিমেন্ট ব্যবহার করে আরাকান আর্মি বাঙ্কার তৈরি করতে পারে—এমন একটি আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চীন-মিয়ানমার-চট্টগ্রাম প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডরকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছেন দুই দেশের শতাধিক ব্যবসায়ী। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় বেইজিং এই করিডর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এস এম নুরুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের পর দুই দেশের বাণিজ্য কমে আগের তুলনায় মাত্র ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলে বাণিজ্য আবার চাঙ্গা হবে। প্রস্তাবিত করিডরটি বাস্তবায়িত হলে সরাসরি চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে পণ্য বিনিময় করা যাবে, যার ফলে পণ্য পরিবহনের সময় (লিড টাইম) ১০ দিন থেকে কমে মাত্র ১ দিনে নেমে আসবে।





























