সাতক্ষীরায় ফেসবুক লাইভ করে যুবককে পিটিয়ে হত্যা
- আপডেট সময় : ০১:০৬:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করে লোকজন জড়ো করা হয়। এরপর তাঁকে দফায় দফায় মারধর করা হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও সেখানে পুনরায় হামলা চালানো হয় এবং টেনেহিঁচড়ে বাইরে এনে পেটানো হয়। ঘটনার শেষে মরদেহের ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া হয়।
ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী তাঁর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে লোকজন জড়ো করতে দুই দফা লাইভ করেন। গত মঙ্গলবার বেলা ৩টা ৩১ মিনিটে ১৯ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের প্রথম লাইভে তিনি একটি অডিও শোনান, যা শামীমের বলে দাবি করেন। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীমের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান এবং তাঁর বাড়ির ঠিকানা প্রকাশ করেন। একই দিন বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে তিনি দ্বিতীয়বার লাইভে আসেন। ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের এই লাইভটি তিনি করেন একজন পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে, যেখানে শামীম চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। লাইভ করার সময় তিনি আশপাশের লোকজনকে উসকে দেন এবং সবাইকে চেম্বারের সামনে আসার আহ্বান জানান। একপর্যায়ে সেখানে কয়েক শ মানুষ জড়ো হয় এবং শামীমকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য চিকিৎসককে চাপ দেওয়া হয়।
নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। পরিবারের অভিযোগ, ফজলুল হকের নেতৃত্বে একদল লোক তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান জানান, তাঁর ভাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছিলেন এবং হোমিওপ্যাথি নিয়েও পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন, যা এলাকার মানুষ জানতেন। শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিলের ভাষ্যমতে, গত সোমবার শামীম ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা তৈরি হয়। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্য আছে—এমন অভিযোগ তুলে তাঁদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর শামীমকে প্রথমে বাড়ির পাশের সুবর্ণাবাদ বাজারে মারধর করা হয়। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন এবং পরে পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে আশ্রয় নেন। মঙ্গলবার বিকেলে ফজলুল হকের নেতৃত্বে লোকজন ওই চেম্বার থেকে তাঁকে বের করে মারধর করেন। পুলিশ খবর পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, শতাধিক লোক হাসপাতালে ঢুকে শামীমকে মারধর করে এবং টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীমের মৃত্যু হয়।
অভিযুক্ত ফজলুল হক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অপরাধ হলেও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান ভিন্ন। তিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নয় বলে দাবি করলেও বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি একসময় মসজিদের ইমাম ছিলেন এবং বর্তমানে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন ও পশু জবাইয়ের কাজ করেন। এদিকে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি দলীয় কর্মকাণ্ড নয় এবং জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ফজলুল হক আমিনীর উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ভিডিও ফুটেজ ও প্রযুক্তির সহায়তায় হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং ফজলুল হককে আটকের অভিযান চলছে। শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে ফজলুল হকসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন।


























