ঢাকা ১২:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বিশ্বকাপের নকআউটে মাঠের মতোই উত্তপ্ত গ্যালারি সাংবাদিকতাকে দলীয়করণ না করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরুন: আইয়ুব ভূঁইয়া সাফল্যের মূল চাবিকাঠি আমার খেলোয়াড়রাই, বললেন ফ্রান্স কোচ দেশম সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে সতর্ক আর্জেন্টিনা গৃহকর্মীকে গরম কড়াইয়ের ছ্যাঁকা, খুলনায় পুলিশ দম্পতি গ্রেপ্তার ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের ১৮ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের আরও ৫ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ সংসদে কথা বলার সুযোগ না পেলে বাইরে বলব: হাসনাত আবদুল্লাহ

চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৪:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

টানা ছয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা ও হাটহাজারীসহ অন্তত ১৫টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গত তিন বছরের ব্যবধানে আবারও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে উপজেলাটি।

বন্যার পানিতে হাজার হাজার বসতঘর তলিয়ে গেছে এবং বহু কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে। অধিকাংশ এলাকায় রান্নার সুযোগ না থাকায় বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও অসংখ্য মানুষ এখনো ঘরবাড়িতে অথবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্লাবিত এলাকার অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে থাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বিঘ্ন ঘটছে। বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ধসে পড়েছে এবং বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়া চন্দনাইশ উপজেলার দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাশিমপুর এলাকায় দেড় ফুট পানি থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ডলু নদীর পাহাড়ি ঢলের তোড়ে পৌরসভার রামপুর এলাকায় কয়েকশ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এছাড়া সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আদালত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সার্কেল কার্যালয়, পৌরসভা ও থানায় পানি প্রবেশ করেছে এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করেছে এবং প্রতিটি উপজেলায় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে।

কৃষি ও মৎস্য খাতে নেমে এসেছে বড় বিপর্যয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর আউশ ধান, ৫৬৫ হেক্টর আমনের বীজতলা ও ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ৭ হাজার ৩৭৫টি পুকুর-দিঘি ও ৪৫টি চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়ে ১ হাজার ৮০৫ টন মাছ এবং ৪৮ লাখ ৪০ হাজার পোনা ভেসে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। তবে মাঠপর্যায়ের আরেকটি জরিপে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯১ কোটি টাকা। পটিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও হাটহাজারীর মৎস্য খামারিরা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, যা স্থানীয় বাজারে মাছের সংকট ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে। চন্দনাইশে ৩৩৮টি (৩৩৮ট) মাছের পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৯২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে যাওয়ায় উপজেলা মৎস্য বিভাগ প্রাথমিকভাবে ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার ক্ষতির হিসাব করেছে।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের মৎস্য খাতও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের হাজার হাজার পুকুর, দিঘি, মাছের খামার ও চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে চাষকৃত মাছ ও কোটি কোটি টাকার পোনা।

অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের সমন্বিত আরেকটি জরিপে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব জলাশয়ের মোট আয়তন প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯১ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। পটিয়া উপজেলায় ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর, দিঘি ও মাছের প্রকল্প প্লাবিত হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ

আপডেট সময় : ১০:৩৪:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
print news

টানা ছয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা ও হাটহাজারীসহ অন্তত ১৫টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গত তিন বছরের ব্যবধানে আবারও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে উপজেলাটি।

বন্যার পানিতে হাজার হাজার বসতঘর তলিয়ে গেছে এবং বহু কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে। অধিকাংশ এলাকায় রান্নার সুযোগ না থাকায় বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও অসংখ্য মানুষ এখনো ঘরবাড়িতে অথবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্লাবিত এলাকার অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে থাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বিঘ্ন ঘটছে। বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ধসে পড়েছে এবং বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়া চন্দনাইশ উপজেলার দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাশিমপুর এলাকায় দেড় ফুট পানি থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ডলু নদীর পাহাড়ি ঢলের তোড়ে পৌরসভার রামপুর এলাকায় কয়েকশ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এছাড়া সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আদালত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সার্কেল কার্যালয়, পৌরসভা ও থানায় পানি প্রবেশ করেছে এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করেছে এবং প্রতিটি উপজেলায় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে।

কৃষি ও মৎস্য খাতে নেমে এসেছে বড় বিপর্যয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর আউশ ধান, ৫৬৫ হেক্টর আমনের বীজতলা ও ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ৭ হাজার ৩৭৫টি পুকুর-দিঘি ও ৪৫টি চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়ে ১ হাজার ৮০৫ টন মাছ এবং ৪৮ লাখ ৪০ হাজার পোনা ভেসে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। তবে মাঠপর্যায়ের আরেকটি জরিপে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯১ কোটি টাকা। পটিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও হাটহাজারীর মৎস্য খামারিরা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, যা স্থানীয় বাজারে মাছের সংকট ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে। চন্দনাইশে ৩৩৮টি (৩৩৮ট) মাছের পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৯২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে যাওয়ায় উপজেলা মৎস্য বিভাগ প্রাথমিকভাবে ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার ক্ষতির হিসাব করেছে।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের মৎস্য খাতও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের হাজার হাজার পুকুর, দিঘি, মাছের খামার ও চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে চাষকৃত মাছ ও কোটি কোটি টাকার পোনা।

অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের সমন্বিত আরেকটি জরিপে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব জলাশয়ের মোট আয়তন প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯১ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। পটিয়া উপজেলায় ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর, দিঘি ও মাছের প্রকল্প প্লাবিত হয়েছে।