ঢাকা ১২:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপি নেতা সরোয়ার আলমগীর অসদাচরণ ও দীর্ঘ অনুপস্থিতি: চার পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করল সরকার মাশহাদে পৌঁছাল প্রয়াত আয়াতুল্লাহ খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের লাশ জাতীয় পরিবেশ পদক পেলেন ৩ ব্যক্তি ও ৩ প্রতিষ্ঠান ইসলামি শরিয়তে মৃতদেহ দাফনের সময়সীমা ও করণীয় হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রস্তুতি হোয়াইট হাউসের ঝিনাইদহে শিক্ষার্থীদের চুল কাটালেন স্কুল সভাপতি, অভিভাবকদের সঙ্গে হাতাহাতি জন্মদিনে ৩০০ ম্যানগ্রোভ গাছ লাগিয়ে ব্যতিক্রমী নজির গড়লেন চমক ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া মরক্কো বরিশালে আসামির মৃত্যুর গুজবে থানায় হামলা, আহত ১২

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সোনালি যুগ কি সত্যিই ফুরিয়ে এল

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৩৪:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে তাকালে এখন সহজেই বোঝা যায় যে এদের জৌলুশ আগের তুলনায় কমেছে। ব্যবসায়িক মডেলের সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ব্যবহারকারীরাও এখন এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমানে এই মাধ্যমগুলো অ্যালগরিদম, এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট এবং বটের দখলে চলে গেছে। ব্যবহারকারীদের আচরণেও এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন; আগে যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবনের গল্প বা ছবি শেয়ার করত, এখন তারা সেখানে কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে যন্ত্রের তৈরি ফিড স্ক্রল করে যাচ্ছেন। মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, নজরদারির ভয় এবং রাজনৈতিক কারসাজির কারণে মানুষ এখন ব্যক্তিগত ও ছোট ডিজিটাল পরিসরে আশ্রয় খুঁজছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মৃত্যু ঘটছে, তবে বাস্তবে এটি মরছে না, বরং গত কয়েক বছর ধরে নীরবে এর কাঠামোগত বড় পরিবর্তন ঘটছে।

ডিজিটাল যোগাযোগের ইতিহাস বেশ পুরোনো। আশির ও নব্বইয়ের দশকে কম্পিউসার্ভ, আমেরিকা অনলাইন বা প্রডিজির মতো সার্ভিসের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যাত্রা শুরু হয় ২০০২ সালে ফ্রেন্ডস্টারের মাধ্যমে, যার ব্যবহারকারী এক বছরের মধ্যে ৩০ লাখে পৌঁছায়। ২০০৩ সালে লিংকডইন ও মাইস্পেস আসে এবং ২০০৬ সালের মধ্যে মাইস্পেস গুগলের পরেই বিশ্বের জনপ্রিয় ওয়েবসাইটে পরিণত হয়। ২০০৮ সালের দিকে ফেসবুক মাইস্পেসকে হটিয়ে রাজত্ব দখল করে। নিউজ ফিড ও লাইক বাটনের মাধ্যমে ফেসবুক মানুষকে একটি জীবন্ত ও ব্যক্তিগত ডিজিটাল কমিউনিটি দেয়। অন্যদিকে টুইটার বিশ্বকে একটি গ্লোবাল আড্ডার জায়গা করে দেয়। সেই সময়টি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সোনালি যুগ, যেখানে বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক মেরুকরণ বা অ্যালগরিদমের বাড়াবাড়ি ছিল না।

তবে ২০০৮ সালের পর থেকে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও প্রাইভেসি নিয়ে সংকট শুরু হয়। অ্যালগরিদমের সাজানো ফিড মানুষের তৈরি কনটেন্টের জায়গা দখল করে নেয় এবং স্ক্রিন ভরে যায় ব্র্যান্ড প্রমোশন ও বিজ্ঞাপনে। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটির কম্পিউটেশনাল সোশ্যাল সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক পিটার টর্নবার্গের মতে, এই পতনের পেছনে অ্যালগরিদম বড় দায়ি। অ্যালগরিদম বুঝতে পারে যে মানুষ বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হলে বেশি রিঅ্যাক্ট করে, ফলে তারা উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন তৈরি করে। এই নেতিবাচক পরিবেশ ও সাইবার বুলিংয়ের ভয়ে মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশ কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্ম মানুষকে শর্ট-ভিডিওর নেশায় বুঁদ করে নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মেটা ২০২১ সালের পর থেকে নিজেদের আর সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি হিসেবে দাবিই করে না।

অধ্যাপক পিটার টর্নবার্গের মতে, সমস্যাটি শুধু অ্যালগরিদম বা মানুষের স্বভাব নয়, বরং এই মাধ্যমগুলোর মূল কাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে আছে। সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রায়ই ‘ইকো চেম্বার’ বলা হলেও টর্নবার্গের মতে, বাস্তব জীবনের চেয়ে অনলাইনেই মানুষ ভিন্নমতের মানুষের মুখোমুখি বেশি হয়। সমস্যা হলো রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে আমাদের ধারণার জায়গায়। টর্নবার্গের ২০২২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে স্থানীয় গণ্ডি থেকে বের করে বৈশ্বিক বিতর্কের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে মতের অমিল মানেই শত্রুতা—এমন এক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভবিষ্যতের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে বলে মনে করেন টর্নবার্গ। প্রথমত, মানুষ পাবলিক প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে হোয়াটসঅ্যাপ, ডিসকর্ড বা সাবস্ট্যাকের মতো প্রাইভেট গ্রুপ ও বিশ্বস্ত লেখকদের দিকে ঝুঁকছে। দ্বিতীয়ত, টিকটক বা রিলসের মতো শর্ট-ভিডিওর রাজত্ব অব্যাহত থাকবে। তৃতীয়ত, জেনারেটিভ এআই বা চ্যাটবট মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠছে। তবে টর্নবার্গ সতর্ক করেছেন যে, এই প্রাইভেট গ্রুপগুলোই ভবিষ্যতে সত্যিকারের ইকো চেম্বারের কারখানা হয়ে উঠতে পারে। আমরা এখন প্রযুক্তির এক মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যার প্রভাব ইন্টারনেট আবিষ্কারের মতোই যুগান্তকারী হতে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার উপায় নেই, তাই সচেতন হওয়াই একমাত্র পথ।

নিউজটি শেয়ার করুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সোনালি যুগ কি সত্যিই ফুরিয়ে এল

আপডেট সময় : ০৭:৩৪:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
print news

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে তাকালে এখন সহজেই বোঝা যায় যে এদের জৌলুশ আগের তুলনায় কমেছে। ব্যবসায়িক মডেলের সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ব্যবহারকারীরাও এখন এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমানে এই মাধ্যমগুলো অ্যালগরিদম, এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট এবং বটের দখলে চলে গেছে। ব্যবহারকারীদের আচরণেও এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন; আগে যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবনের গল্প বা ছবি শেয়ার করত, এখন তারা সেখানে কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে যন্ত্রের তৈরি ফিড স্ক্রল করে যাচ্ছেন। মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, নজরদারির ভয় এবং রাজনৈতিক কারসাজির কারণে মানুষ এখন ব্যক্তিগত ও ছোট ডিজিটাল পরিসরে আশ্রয় খুঁজছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মৃত্যু ঘটছে, তবে বাস্তবে এটি মরছে না, বরং গত কয়েক বছর ধরে নীরবে এর কাঠামোগত বড় পরিবর্তন ঘটছে।

ডিজিটাল যোগাযোগের ইতিহাস বেশ পুরোনো। আশির ও নব্বইয়ের দশকে কম্পিউসার্ভ, আমেরিকা অনলাইন বা প্রডিজির মতো সার্ভিসের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যাত্রা শুরু হয় ২০০২ সালে ফ্রেন্ডস্টারের মাধ্যমে, যার ব্যবহারকারী এক বছরের মধ্যে ৩০ লাখে পৌঁছায়। ২০০৩ সালে লিংকডইন ও মাইস্পেস আসে এবং ২০০৬ সালের মধ্যে মাইস্পেস গুগলের পরেই বিশ্বের জনপ্রিয় ওয়েবসাইটে পরিণত হয়। ২০০৮ সালের দিকে ফেসবুক মাইস্পেসকে হটিয়ে রাজত্ব দখল করে। নিউজ ফিড ও লাইক বাটনের মাধ্যমে ফেসবুক মানুষকে একটি জীবন্ত ও ব্যক্তিগত ডিজিটাল কমিউনিটি দেয়। অন্যদিকে টুইটার বিশ্বকে একটি গ্লোবাল আড্ডার জায়গা করে দেয়। সেই সময়টি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সোনালি যুগ, যেখানে বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক মেরুকরণ বা অ্যালগরিদমের বাড়াবাড়ি ছিল না।

তবে ২০০৮ সালের পর থেকে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও প্রাইভেসি নিয়ে সংকট শুরু হয়। অ্যালগরিদমের সাজানো ফিড মানুষের তৈরি কনটেন্টের জায়গা দখল করে নেয় এবং স্ক্রিন ভরে যায় ব্র্যান্ড প্রমোশন ও বিজ্ঞাপনে। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটির কম্পিউটেশনাল সোশ্যাল সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক পিটার টর্নবার্গের মতে, এই পতনের পেছনে অ্যালগরিদম বড় দায়ি। অ্যালগরিদম বুঝতে পারে যে মানুষ বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হলে বেশি রিঅ্যাক্ট করে, ফলে তারা উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন তৈরি করে। এই নেতিবাচক পরিবেশ ও সাইবার বুলিংয়ের ভয়ে মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশ কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্ম মানুষকে শর্ট-ভিডিওর নেশায় বুঁদ করে নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মেটা ২০২১ সালের পর থেকে নিজেদের আর সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি হিসেবে দাবিই করে না।

অধ্যাপক পিটার টর্নবার্গের মতে, সমস্যাটি শুধু অ্যালগরিদম বা মানুষের স্বভাব নয়, বরং এই মাধ্যমগুলোর মূল কাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে আছে। সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রায়ই ‘ইকো চেম্বার’ বলা হলেও টর্নবার্গের মতে, বাস্তব জীবনের চেয়ে অনলাইনেই মানুষ ভিন্নমতের মানুষের মুখোমুখি বেশি হয়। সমস্যা হলো রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে আমাদের ধারণার জায়গায়। টর্নবার্গের ২০২২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে স্থানীয় গণ্ডি থেকে বের করে বৈশ্বিক বিতর্কের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে মতের অমিল মানেই শত্রুতা—এমন এক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভবিষ্যতের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে বলে মনে করেন টর্নবার্গ। প্রথমত, মানুষ পাবলিক প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে হোয়াটসঅ্যাপ, ডিসকর্ড বা সাবস্ট্যাকের মতো প্রাইভেট গ্রুপ ও বিশ্বস্ত লেখকদের দিকে ঝুঁকছে। দ্বিতীয়ত, টিকটক বা রিলসের মতো শর্ট-ভিডিওর রাজত্ব অব্যাহত থাকবে। তৃতীয়ত, জেনারেটিভ এআই বা চ্যাটবট মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠছে। তবে টর্নবার্গ সতর্ক করেছেন যে, এই প্রাইভেট গ্রুপগুলোই ভবিষ্যতে সত্যিকারের ইকো চেম্বারের কারখানা হয়ে উঠতে পারে। আমরা এখন প্রযুক্তির এক মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যার প্রভাব ইন্টারনেট আবিষ্কারের মতোই যুগান্তকারী হতে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার উপায় নেই, তাই সচেতন হওয়াই একমাত্র পথ।