সংস্কার ও সংসদীয় পদ নিয়ে সরকার-বিরোধী দলের দূরত্ব আরও স্পষ্ট
- আপডেট সময় : ১০:০৬:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়নের আইন তৈরির প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে শেষ পর্যন্ত সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সংসদের অন্যতম কাজ হওয়ার কথা ছিল সংস্কারের আইনি ভিত্তি তৈরি করা। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা সংস্কার প্রস্তাবগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এই অধিবেশন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মাত্র ৯ কার্যদিবসের এই অধিবেশনে আইন প্রণয়নে তাড়াহুড়া এবং পরমতসহিষ্ণুতার ঘাটতি যেমন দেখা গেছে, তেমনি জ্বালানি, গ্যাস ও সারসংকটের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও হয়েছে।
গত ২৭ আগস্ট শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া এই অধিবেশনে মোট ছয়টি বিল পাস হয়েছে। সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন বিধিতে ১৫০টির বেশি নোটিশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য জমা পড়া ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সংসদের ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ৩৫টি এই অধিবেশনেই গঠিত হয়েছে, যার বাকিগুলো আগেই গঠিত হয়েছিল। তবে অধিবেশনজুড়ে মূল বিরোধ ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন এবং সংস্কার-সংশ্লিষ্ট তিনটি বিল পাসকে কেন্দ্র করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ প্রথম অধিবেশনে বিল আকারে না আনায় কার্যকারিতা হারায় এবং ৭টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। সরকার পরে আরও শক্তিশালী বিল আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত নতুন দুটি বিল নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছে বিরোধী দল। তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের চেয়ে পাস হওয়া বিল দুটি অনেক দুর্বল। এর প্রতিবাদে বিরোধী দল বিল পাসের সময় ওয়াকআউট করে এবং প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। যদিও সরকারের দাবি, বিল দুটিকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করা হয়েছে।
আইনের পার্থক্যের জায়গায় দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের সরাসরি ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন আইনে বলা হয়েছে, কমিশন কেবল সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। একইভাবে গুমের অভিযোগ তদন্তের ভার আগের অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হলেও, নতুন আইনে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শৃঙ্খলা বাহিনীকে। তবে কোনো বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেই বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না। এছাড়া র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের বিল নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। বিরোধী দলের মতে, এটি কেবল ‘সাইনবোর্ড’ বদল, কারণ র্যাবের জনবল, সম্পদ ও ক্ষমতা একই থাকছে।
অধিবেশনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিরোধ ছিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে করার কথা ছিল। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদও সংসদের আসনের সংখ্যানুপাতে বণ্টনের প্রস্তাব ছিল। সংসদে প্রায় ২৬ শতাংশ আসন থাকা বিরোধী দলের জুলাই সনদ অনুযায়ী ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির ১০টিসহ মোট ১৪টি সভাপতি পদ পাওয়ার কথা থাকলেও তারা পেয়েছে মাত্র একটি। এই পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি দল শর্ত দিয়েছে যে, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দিলে জুলাই সনদ অনুযায়ী পদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বিরোধী দল এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তারা সংবিধান সংশোধন নয়, বরং সংস্কারের পক্ষে। দ্বিতীয় অধিবেশনে গঠিত এই বিশেষ কমিটিতে তৃতীয় অধিবেশনেও বিরোধী দল কোনো নাম দেয়নি।
সংসদীয় কমিটি গঠনে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিছু কমিটিতে মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা, চিফ হুইপ ও হুইপদের সভাপতি করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ছাড়াও প্রতিমন্ত্রীকে সদস্য করা হয়েছে। কার্যপ্রণালি বিধিতে বাধা না থাকলেও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজেই এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, নির্বাহী বিভাগ যদি নিজেই কমিটির সভাপতি হয়, তবে তারা কার কাছে জবাবদিহি করবে? এটিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চেতনার আলোকে দেখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
আইন পাসের ক্ষেত্রে প্রথম অধিবেশনের মতো এই অধিবেশনেও তাড়াহুড়া লক্ষ্য করা গেছে। কোনো সময়সীমার বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও ৯ কার্যদিবসে ৬টি বিল পাস করা হয়েছে। এসআরবি বিল ছাড়া অন্য বিলগুলো পরীক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিকে মাত্র দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছিল এবং কমিটিগুলো মাত্র একটি করে বৈঠক করেছে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এ বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের সমালোচনা করে বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বিল দ্রুত আইনসভায় পাঠানো উচিত, যাতে সংসদ সদস্যরা তা ভালোভাবে পড়ার সুযোগ পান। বিল সময়মতো না পাওয়ায় তিনি সংসদে হতাশাও প্রকাশ করেন।
সংসদে ভিন্নমত প্রকাশের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অধিবেশনের প্রথম দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের প্রতিবাদের মুখে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মন্তব্য করেন, সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কিছুটা চিন্তিত। অধিবেশনের শেষের দিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের সদস্যদের হট্টগোল এবং অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তখন বলেন, একজন সদস্যের বক্তব্যে বাধা দেওয়া গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী।
তবে রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারসংকটের মতো জনস্বার্থের বিষয়ে অধিবেশনে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। জ্বালানিসংকটের জন্য সরকার অতীতের ভুল নীতি ও দুর্নীতিকে দায়ী করে সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। অন্যদিকে সারসংকট নিয়ে সরকারের পর্যাপ্ত মজুতের দাবির বিপরীতে বিরোধী দল কৃষকের কাছে সার না পৌঁছানোর জন্য বিতরণব্যবস্থার ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে।
সার্বিক বিষয়ে সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আরও ভালো করার কথা বলে সরকার অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধে যে বিল পাস হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে। সুপ্রিম কোর্ট-সংক্রান্ত কোনো বিলও আনা হয়নি। সংস্কার প্রশ্নে সরকারের এখন পর্যন্ত ‘ট্র্যাক রেকর্ড’ হতাশাজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।





























