নেসকো কার্যালয় স্থানান্তর নিয়ে দুই মন্ত্রীর দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত রাজনীতি

- আপডেট সময় : ০৩:৩৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দুই মন্ত্রীর মধ্যে শুরু হওয়া বাকযুদ্ধ এখন স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনোভাবেই নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে সরানো যাবে না। প্রয়োজনে তিনি নিজেই এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালন করছে নেসকো। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর প্রধান কার্যালয়টি রাজশাহীতে অবস্থিত। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এটি বগুড়ায় স্থানান্তরের আলোচনা শুরু হয়। বগুড়ার শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন। এরপর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
এই উদ্যোগের খবর জানাজানি হতেই রাজশাহীর সামাজিক সংগঠনগুলো মানববন্ধন করে এবং রাজনৈতিক নেতারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আন্দোলনের মুখে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম তখন জানান, প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসে তিনি বগুড়ায় একটি আঞ্চলিক কার্যালয় করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি ফাঁসের পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। গত ১৬ই জুলাই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়ে মতামত চাইলে রাজশাহীবাসীর মনে সন্দেহ দানা বাঁধে যে, স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি নীরবেই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, "রাজশাহীর মানুষ সারাদিন চিৎকার করে। অথচ পঞ্চগড় পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিদ্যুৎ সার্ভিস। আপনাদের এত ব্যথা লাগে কেন? ব্যথা লাগাবেন না ভাই। হোক না বগুড়ায় হেড অফিস, আপনারা জোনাল অফিস নেন।" তিনি আরও বলেন, "যতই সমালোচনা করেন, পার্লামেন্টে বলেন বা বাইরে বলেন, আমিসহ বগুড়ার সাতজন এমপি বগুড়ার উন্নয়নের ব্যাপারে একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নই।" প্রতিমন্ত্রীর এই মন্তব্য রাজশাহীর নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু নিজের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, শুধু নেসকো নয়, রাজশাহীর কোনো প্রতিষ্ঠানই অন্য কোথাও সরানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তিনি নিজে রাজপথে নামবেন। এ সময় ১৯৯২ সালের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে মিনু বলেন, তিনি যখন রাজশাহীর মেয়র ছিলেন, তখন রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় সদর দপ্তর চট্টগ্রামে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় অনশন, মিছিল ও আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি সেই সিদ্ধান্ত প্রতিহত করেছিলেন। যেভাবে পশ্চিমাঞ্চল রেল রক্ষা করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই নেসকোকেও রক্ষা করবেন।
ভূমিমন্ত্রী আরও জোর দিয়ে বলেন, তার কাছে মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্য পদের চেয়ে রাজশাহীর স্বার্থ অনেক বড়। এই মাটিতেই তার জন্ম এবং এখানেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে চান। রাজশাহীর স্বার্থবিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে তিনি জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। তার এই বক্তব্যে উপস্থিত জনতা করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানান। ভূমিমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নেসকোর প্রধান কার্যালয় রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতারাও আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন এবং ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেছে।




























