খোয়াই নদীর বাঁধে ফের ভাঙন, হবিগঞ্জে প্লাবিত ২০ গ্রাম
- আপডেট সময় : ১০:২৫:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল স্রোতের তোড়ে হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। রোববার দুপুরে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় বাঁধের একটি অংশ ভেঙে লোকালয়ে দ্রুত পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের কয়েকটি অংশে পানি ওঠায় যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, ভারতের ত্রিপুরায় প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে সেখানকার চাকমা ব্যারেজের গেটগুলো খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে খোয়াই নদীর পানি প্রবল বেগে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে। একপর্যায়ে চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। পানির এই তীব্র চাপে সদর উপজেলার কালিগঞ্জ এলাকার দুর্বল বাঁধটি আবারও ভেঙে যায়। এর আগে গত ৯ জুলাই রাতে ঠিক একই স্থানে বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। নষ্ট হয়েছিল শত কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ এবং তলিয়ে গিয়েছিল হাজার হাজার একর ফসলি জমি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত জুলাই মাসের ভয়াবহ ভাঙনের পর ৪৩ দিন পার হয়ে গেলেও বাঁধ মেরামতের কাজ পুরোপুরি শেষ করা হয়নি। সংস্কারকাজ অসমাপ্ত রেখেই বর্ষা মৌসুমের মধ্যে উজান থেকে নতুন করে ঢল নামায় দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি পানির চাপ সহ্য করতে পারেনি। ফলে একই স্থানে আবারও ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। জুলাইয়ের বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যখন ঘরবাড়ি ও ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই নতুন করে এই ভাঙন তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন বর্ষার মধ্যেই এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি স্থায়ী ও টেকসইভাবে সুরক্ষিত করা সম্ভব হলো না। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভাঙন আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ৯ জুলাইয়ের ভাঙনের পর বাঁধটি পুনরায় নির্মাণের জন্য সরকার ৮৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। গতকাল রোববার সকালে বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছ ঘটনাস্থলে গিয়ে চলমান মেরামতকাজ পরিদর্শন করেছিলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ, পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ এবং হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনকালে এমপি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, আবারও বাঁধ ভাঙলে এলাকায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। তাঁর এই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো।
এদিকে স্থানীয়দের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, খোয়াই নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে নদীর তীর ও প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন অংশ অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন করে পানি প্রবেশ করায় কালিগঞ্জ ও এর আশপাশের গ্রামের মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেক বাড়িঘরের উঠান ও রাস্তাঘাট ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে। কৃষিজমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের নিচু অংশগুলো তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পানি আরও বাড়লে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি হ্রাস পেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।


























