ঢাকা ১০:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ পেলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন সচিবালয়ে বড় রদবদল: বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব পেলেন কর্মকর্তারা মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন এবং নতুন সচিবালয়ের অনুমোদন মাঝআকাশে দরজা খুলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জরুরি অবতরণ, ঢাকায় রোগীর মৃত্যু আগামী ৭ জানুয়ারি শুরু অমর একুশে বইমেলা ২০২৭ ওয়েবসাইট ও টেলিগ্রামে মাদক বিক্রি, ভাটারায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার প্যারিসে সহিংসতা ও অস্থিরতা: ২০২৭ নির্বাচন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরিত হচ্ছে সচিবালয়, অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা শায়েস্তাগঞ্জে জয়ন্তিকা ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন, যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ ঢাকায় পা রাখল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শুরু হচ্ছে টেস্ট সিরিজের লড়াই

প্রযুক্তির যুগে দাওয়াহর সম্ভাবনা ও দাঈদের নিয়ত রক্ষার চ্যালেঞ্জ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১১:০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের এই যুগে ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচার বা দাওয়াহর মাধ্যম ও পরিধিতে এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। প্রাচীনকালে মদীনার এক অন্ধকার রাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর লিখানো একটি চিঠি মাসের পর মাস পথ পাড়ি দিয়ে উটের পিঠে চড়ে পৌঁছাত রোম বা পারস্যের সীমান্তে। আজ সেই একই বার্তা এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে কোটি মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্ক্রিনে পৌঁছে যাচ্ছে। সময় ও প্রযুক্তির এই পরিবর্তনে দাওয়াহর মূল দায়িত্ব অপরিবর্তিত থাকলেও এর পরিধি ও জটিলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইসলামে দাওয়াহ কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং একে দ্বীনের হৃৎপিণ্ড বলা যায়। পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, 'তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজে নিষেধ করো।' এই নির্দেশ পালনে দাওয়াহর মাধ্যম যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। সাহাবিদের আমলে মুখের কথা ও চিঠি, তাবেইদের যুগে বই ও গ্রন্থাগার, এবং উসমানীয় আমলে ছাপাখানার পর আজ আমাদের হাতে রয়েছে অভাবনীয় প্রযুক্তিগত শক্তি।

বর্তমান সময়ে একটি সাধারণ স্মার্টফোন একই সঙ্গে মসজিদ, লাইব্রেরি, শ্রেণিকক্ষ এবং জনসমাবেশের বিকল্প হয়ে উঠেছে। ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিও বা পোস্ট একজন সাধারণ তরুণ বা সংশয়ে থাকা তরুণীর জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। মহানবী (সা.) নিজেও তাঁর সময়ে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় লেখক নিয়োগ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে দূত পাঠানো কিংবা শিক্ষিত যুদ্ধবন্দিদের মাধ্যমে মুসলিম শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার মতো কার্যকর যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেছিলেন। বর্তমানের প্রযুক্তি সেই নীতিরই আধুনিক রূপ।

আজকের সময়ে দাওয়াহর ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা অতীতে অকল্পনীয় ছিল। মুহূর্তের মধ্যে অনুবাদ সুবিধা এবং বেনামে নিজের সংশয় দূর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অ্যালগরিদম গভীর আলোচনার চেয়ে চটকদার ও উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়কে বেশি ছড়িয়ে দেয়। ফলে দাঈদের জন্য জনপ্রিয়তার মোহ এড়িয়ে বার্তার গভীরতা বজায় রাখা অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ, রিয়্যাকশন আর শেয়ারের মোহ দাঈদের নিয়ত বা ইখলাসকে নষ্ট করতে পারে। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক আলেমকে জাহান্নামে পাঠানো হবে, যিনি কেবল মানুষের কাছে 'আলেম' হিসেবে পরিচিত হওয়ার আশায় ইলম শিক্ষা দিয়েছিলেন ও কুরআন পাঠ করেছিলেন। তাই দাঈদের প্রতিনিয়ত নিজের নিয়ত পরীক্ষা করা আবশ্যক।

দাওয়াহর ক্ষেত্রে সূরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, 'তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে, আর তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো এমনভারে যা সর্বোত্তম।' কিন্তু ইন্টারনেটে অনেক সময় রাগ, তাচ্ছিল্য, অন্য ধর্মকে ছোট করা বা ভিন্নমতের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করে ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়, যা দাওয়াহর মূল চেতনার পরিপন্থী। সহীহ মুসলিমের আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যাকে কোমলতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাকে সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত করা হয়।'

প্রযুক্তির কারণে আজ যে কেউ নিজেকে দ্বীনের মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে, যার ফলে জ্ঞান ও ব্যক্তিগত মতামতের পার্থক্য মুছে যাচ্ছে। অগভীর জ্ঞানের মানুষরা জটিল ফিকহি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, যা প্রকৃত আলেমদের বছরের পর বছর সাধনাকে অবমূল্যায়ন করে। তাই সাধারণ মানুষের জন্য বক্তার নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্যের উৎস যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রযুক্তি কখনোই মানুষের হৃদয়ের সরাসরি স্পর্শের বিকল্প নয়। ডিজিটাল মাধ্যমকে দাওয়াহর প্রথম প্রবেশদ্বার এবং মানবিক সম্পর্ককে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর মডেল। গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষক ও লেখক এই বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন, প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী মুসলিমেরই আজ এই দাওয়াহর দায়িত্ব রয়েছে। সহীহ বুখারির হাদিস অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, 'আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, যদিও তা একটিমাত্র আয়াত হয়।' এই দায়িত্ব পালনে এখন আর উটের পিঠে চড়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল একটি আন্তরিক হৃদয়, সততাপূর্ণ কণ্ঠ এবং একটি স্ক্রিন।

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২৪আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২৭

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রযুক্তির যুগে দাওয়াহর সম্ভাবনা ও দাঈদের নিয়ত রক্ষার চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ১১:০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের এই যুগে ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচার বা দাওয়াহর মাধ্যম ও পরিধিতে এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। প্রাচীনকালে মদীনার এক অন্ধকার রাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর লিখানো একটি চিঠি মাসের পর মাস পথ পাড়ি দিয়ে উটের পিঠে চড়ে পৌঁছাত রোম বা পারস্যের সীমান্তে। আজ সেই একই বার্তা এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে কোটি মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্ক্রিনে পৌঁছে যাচ্ছে। সময় ও প্রযুক্তির এই পরিবর্তনে দাওয়াহর মূল দায়িত্ব অপরিবর্তিত থাকলেও এর পরিধি ও জটিলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইসলামে দাওয়াহ কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং একে দ্বীনের হৃৎপিণ্ড বলা যায়। পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, 'তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজে নিষেধ করো।' এই নির্দেশ পালনে দাওয়াহর মাধ্যম যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। সাহাবিদের আমলে মুখের কথা ও চিঠি, তাবেইদের যুগে বই ও গ্রন্থাগার, এবং উসমানীয় আমলে ছাপাখানার পর আজ আমাদের হাতে রয়েছে অভাবনীয় প্রযুক্তিগত শক্তি।

বর্তমান সময়ে একটি সাধারণ স্মার্টফোন একই সঙ্গে মসজিদ, লাইব্রেরি, শ্রেণিকক্ষ এবং জনসমাবেশের বিকল্প হয়ে উঠেছে। ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিও বা পোস্ট একজন সাধারণ তরুণ বা সংশয়ে থাকা তরুণীর জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। মহানবী (সা.) নিজেও তাঁর সময়ে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় লেখক নিয়োগ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে দূত পাঠানো কিংবা শিক্ষিত যুদ্ধবন্দিদের মাধ্যমে মুসলিম শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার মতো কার্যকর যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেছিলেন। বর্তমানের প্রযুক্তি সেই নীতিরই আধুনিক রূপ।

আজকের সময়ে দাওয়াহর ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা অতীতে অকল্পনীয় ছিল। মুহূর্তের মধ্যে অনুবাদ সুবিধা এবং বেনামে নিজের সংশয় দূর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অ্যালগরিদম গভীর আলোচনার চেয়ে চটকদার ও উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়কে বেশি ছড়িয়ে দেয়। ফলে দাঈদের জন্য জনপ্রিয়তার মোহ এড়িয়ে বার্তার গভীরতা বজায় রাখা অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ, রিয়্যাকশন আর শেয়ারের মোহ দাঈদের নিয়ত বা ইখলাসকে নষ্ট করতে পারে। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক আলেমকে জাহান্নামে পাঠানো হবে, যিনি কেবল মানুষের কাছে 'আলেম' হিসেবে পরিচিত হওয়ার আশায় ইলম শিক্ষা দিয়েছিলেন ও কুরআন পাঠ করেছিলেন। তাই দাঈদের প্রতিনিয়ত নিজের নিয়ত পরীক্ষা করা আবশ্যক।

দাওয়াহর ক্ষেত্রে সূরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, 'তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে, আর তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো এমনভারে যা সর্বোত্তম।' কিন্তু ইন্টারনেটে অনেক সময় রাগ, তাচ্ছিল্য, অন্য ধর্মকে ছোট করা বা ভিন্নমতের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করে ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়, যা দাওয়াহর মূল চেতনার পরিপন্থী। সহীহ মুসলিমের আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যাকে কোমলতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাকে সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত করা হয়।'

প্রযুক্তির কারণে আজ যে কেউ নিজেকে দ্বীনের মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে, যার ফলে জ্ঞান ও ব্যক্তিগত মতামতের পার্থক্য মুছে যাচ্ছে। অগভীর জ্ঞানের মানুষরা জটিল ফিকহি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, যা প্রকৃত আলেমদের বছরের পর বছর সাধনাকে অবমূল্যায়ন করে। তাই সাধারণ মানুষের জন্য বক্তার নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্যের উৎস যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রযুক্তি কখনোই মানুষের হৃদয়ের সরাসরি স্পর্শের বিকল্প নয়। ডিজিটাল মাধ্যমকে দাওয়াহর প্রথম প্রবেশদ্বার এবং মানবিক সম্পর্ককে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর মডেল। গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষক ও লেখক এই বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন, প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী মুসলিমেরই আজ এই দাওয়াহর দায়িত্ব রয়েছে। সহীহ বুখারির হাদিস অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, 'আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, যদিও তা একটিমাত্র আয়াত হয়।' এই দায়িত্ব পালনে এখন আর উটের পিঠে চড়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল একটি আন্তরিক হৃদয়, সততাপূর্ণ কণ্ঠ এবং একটি স্ক্রিন।

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২৪আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২৭

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh