ইয়েভা স্কালিয়েতস্কার ডায়েরিতে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও শৈশবের গল্প
- আপডেট সময় : ০২:৩৮:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

“যতক্ষণ না আপনি সেখানে ছিলেন, ততক্ষণ আপনি জানেন না যুদ্ধ কী।” ১২ বছরের ইউক্রেনীয় কিশোরী ইয়েভা স্কালিয়েতস্কার লেখা বই ‘ইউ ডোন্ট নো হোয়াট ওয়ার ইজ: দ্যা ডাইরি অফ এ ইয়ং গার্ল’-এর মূল সুর এটিই। যুদ্ধের কবলে পড়ে একটি শিশুর জীবন কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়, এটি তারই এক অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও হৃদয়স্পর্শী দলিল।
যুদ্ধের আগে খারকিভের উপকণ্ঠে দাদি ইরিনার সঙ্গে থাকতেন ইয়েভা। তাদের অ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে রাশিয়ার সীমান্তের দিকে বিস্তৃত ফাঁকা মাঠ দেখা যেত। তখন ইয়েভার জীবন ছিল সাধারণ শিশুদের মতোই—ছবি আঁকা, বোলিং খেলা, বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করা এবং স্কুলে ইংরেজি শেখা ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন।
কিন্তু ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার আগ্রাসন ও খারকিভে বোমাবর্ষণ শুরু হলে তার সেই স্বাভাবিক জীবন চিরতরে হারিয়ে যায়। ইয়েভা ও তার দাদি বাধ্য হয়ে বাড়ির বেসমেন্টে আশ্রয় নেন। আকাশজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্রের আনাগোনা, বিস্ফোরণের বিকট শব্দ এবং প্রতি রাতের বোমার আতঙ্ক তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ইয়েভার ডায়েরির সঙ্গে তার দাদির তোলা কিছু ছবি যুক্ত রয়েছে, যেখানে শিশুটির মুখে ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের ছাপ স্পষ্ট। এছাড়া বইটিতে ইয়েভার স্কুলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কিছু বার্তাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে তার সহপাঠীরা আতঙ্কের মাঝেও একে অপরকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করেছে।
যুদ্ধের ভয়াবহতায় ইয়েভার প্রিয় শহর খারকিভের পার্ক, মঠ ও পুরোনো ভবনগুলো ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে। এক পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইয়েভার নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে দাদির সঙ্গে সে শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশ ছাড়ার আগে চ্যানেল ফোরের এক সাংবাদিকের নেওয়া ইয়েভার সাক্ষাৎকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
ইউক্রেন থেকে বুদাপেস্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত ইয়েভা ও তার দাদি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে পৌঁছান এবং গ্যারি ও ক্যাথরিন নামে এক দম্পতির আশ্রয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। বইটির শেষ অংশে তার বন্ধুদের বর্তমান অবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণও উঠে এসেছে, যা যুদ্ধের নিষ্ঠুর প্রভাবকে আরও গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলে।
ইয়েভার লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সরলতা। কোনো জটিলতা ছাড়াই সে নিজের অভিজ্ঞতা নিজের ভাষায় লিখেছে। মাত্র ১২ বছর বয়সে এমন সংযত ও স্পষ্ট ভাষায় যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরা বিস্ময়কর। ব্লুমসবেরি থেকে প্রকাশিত এই বইটি কেবল একটি যুদ্ধের গল্প নয়, এটি যুদ্ধের মধ্যে বেড়ে ওঠা এক শিশুর ভয়, বিচ্ছেদ ও অনিশ্চয়তার দলিল। বর্তমান সময়ে যখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্লান্তি দেখা দিচ্ছে, তখন ইয়েভার এই ডায়েরি মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধ কেবল সংবাদ শিরোনাম নয়, এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ভেঙে যাওয়া জীবন ও শিশুদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

























