নব্য চাঁদাবাজদের কবলে রাজধানী, বাড়ছে সহিংসতা ও প্রাণহানি
- আপডেট সময় : ০৪:৩৪:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর প্রতিটি খাতে এখন চাঁদাবাজির বিস্তার ঘটেছে। ফুটপাত, কাঁচাবাজার, পরিবহন, অটোরিকশা, নদীর ঘাট, ময়লা ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—সবখানেই সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নব্য চাঁদাবাজদের জিম্মি দশায় পড়েছেন। আগে মাফিয়া বা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য থাকলেও এখন টোকাইরাও চাঁদাবাজিতে নেমেছে। বিশেষ করে নব্য চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে রাজধানীবাসী পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছেন। চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে লাগাতার হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয়তা এবং অপরাধীদের দমনে দৃশ্যমান ব্যর্থতার কারণে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক, কেরানীগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকাগুলো এখন সাধারণ মানুষের জন্য চরম আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশে চাঁদাবাজির ঘটনায় ৬৯৬টি মামলা হয়েছে এবং ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে ডিএমপির তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে রাজধানীতে চাঁদাবাজির ঘটনায় ২৩৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৫৮টি, এপ্রিলে ৭১টি এবং মে মাসে ৬১টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
চাঁদা না দিলে মারধর, হুমকি-ধমকি এবং নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা শুরু কিংবা মাছ ধরার মতো সাধারণ কাজেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে পল্লবীতে যুবদল নেতা ইউসুফ ও গোলাম কিবরিয়া, কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির এবং মৌচাকে বেল্লাল হোসেনের মতো রাজনৈতিক কর্মীরা প্রকাশ্যে খুনের শিকার হয়েছেন।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় থানার পেছনে ওয়াসার পানির পাম্পসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২০ বছর ধরে মাছ বিক্রি করা জাকির হোসেন চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আর ব্যবসা করতে পারছেন না। নতুন করে দোকানের দখল রাখতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা এবং প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে স্থান ছাড়তে বাধ্য করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন খাতে প্রভাবশালী এক ব্যক্তির আশ্রয়ে শতাধিক চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া সায়দাবাদ, জনপদের মোড় ও ধলপুর এলাকায় পরিবহন খাত থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যা স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে পুলিশ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।
নিউমার্কেট এলাকাতেও দোকান দখল, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ বিল, পার্কিং ফি ও মাসিক ভাড়ার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের লোগো সম্বলিত রসিদ ব্যবহার করে পার্কিং ফি তোলা হলেও সেই টাকা সিটি করপোরেশনে জমা হয় না। নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে ফুটপাতের ৫০০ দোকান থেকে বিদ্যুৎ বিলের নামে দোকানপ্রতি ২,৫০০ টাকা এবং ১৫০টি দোকান দখলে নিয়ে অগ্রিম ৩ লাখ টাকা ও মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাড়ার অভিযোগ রয়েছে। নিউ মার্কেটের ফুটপাতে ৮০০ থেকে ৮৫০ জন হকার রয়েছেন, যাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা তোলা হচ্ছে।
রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ২৯ জুলাই মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সবুজবাগে এক বিএনপি কর্মী ও হাজারীবাগে এক তরুণ নিহত হয়েছেন। ডিএমপি সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাজধানীতে ১২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০ জন নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দখলবাণিজ্য ও চাঁদাবাজির তথ্য উঠে এসেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিদিনের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ চাঁদা হিসেবে দিতে বাধ্য হওয়ায় তারা আর্থিক সংকট, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

























