মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পূর্বাভাস

- আপডেট সময় : ০৬:৫৩:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি যদি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারও অতিক্রম করতে পারে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর পর গত কয়েক মাসে বিকল্প সরবরাহপথ ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্ববাজার বড় ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ তুলনামূলক সীমিত ছিল। তখন তেলের দাম বাড়লেও তা ২০২২ সালের ১২৮ ডলার বা ২০০৮ সালের মন্দার আগে রেকর্ড ১৪৬ ডলারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সেই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, সংঘাত এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এতদিন বাজারে যে ধারণা ছিল যে যেকোনো সংকটেরই বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া যায়, এবার সেই ধারণা বদলে যেতে পারে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়েছে, যেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৪ ডলার এবং ডিজেলের দাম ৫.২০ ডলারের বেশি হয়েছে। মার্কিন বন্ডবাজারও প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানের হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের পথে সরিয়ে নেয়ার যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, হুতি গোষ্ঠীর অবরোধের কারণে বাব আল-মান্দেব প্রণালি অকার্যকর হয়ে পড়ায় তা ঝুঁকিতে পড়েছে। এতে সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সুয়েজ খাল দিয়ে বিকল্প পথে তেল পাঠানো সম্ভব হলেও বড় জাহাজগুলো সেখানে চলাচল করতে পারে না, ফলে চার সপ্তাহের যাত্রা আট সপ্তাহে দীর্ঘ হতে পারে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বীমা ও টোল সংক্রান্ত জটিলতায়। ইরান প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ থেকে ২ ডলার টোল আরোপের পরিকল্পনা করছে, যা লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের মতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট জাহাজের বীমা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সংকট এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার এবং কৃষ্ণ সাগরের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করেছে। যুদ্ধের আগে দেশটি প্রতিদিন ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করত, যা বৈশ্বিক সরবরাহের ১২ শতাংশ। এ ছাড়া কৃষ্ণ সাগরের পাইপলাইনে বিঘ্ন ঘটায় প্রতিদিন আরও ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজার থেকে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের বড় পার্থক্য হলো বৈশ্বিক তেলের মজুত দ্রুত কমে যাওয়া। গত পাঁচ মাসে মজুত প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলভাণ্ডার ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে এবং গত বসন্ত থেকে সেখান থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়েছে। চীন যুদ্ধের আগে বিপুল তেল মজুত করলেও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে দেশটিকে আবারও বড় পরিসরে আমদানি বাড়াতে হবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের তেল গবেষণা প্রধান ড্যান স্ট্রুইভেনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে অক্টোবরের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর হেলিমা ক্রফটের আশঙ্কা, পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হলে দাম ১৫০ ডলারের নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।



























