এআই নিয়ে ইলন মাস্কের দুই কূটাভাস ও এক স্ববিরোধী আচরণ
- আপডেট সময় : ০২:৫২:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুতগতির বিকাশ মানবজাতির জন্য এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে প্রতিভাবান ও প্রভাবশালী অগ্রদূতদের একজন হওয়া সত্ত্বেও ইলন মাস্ক এআই নিয়ে এক গভীর কূটাভাস ও স্ববিরোধী আচরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। সম্প্রতি ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ সাময়িকীকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের বিভ্রান্তিকর ও স্ববিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিগুলো খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাৎকারে মাস্কের দুটি প্রধান কূটাভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর এই ধনকুবের অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা তার নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাকেসহ সমগ্র মানবজাতিকে ক্ষমতাহীন করে তুলবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়েও তিনি এমন এক অসীম প্রাচুর্যের বিশ্বের স্বপ্ন দেখছেন, যেখানে অর্থ বা তার নিজস্ব ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের কোনো মূল্যই থাকবে না। তবে মুখে এসব কথা বললেও মাস্কের বাস্তব কর্মকাণ্ড এমনভাবে চলছে যেন তার এই দাবিগুলো সত্য নয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে ২৪০ মিলিয়নেরও বেশি অনুসারী থাকা মাস্ক অত্যন্ত বিতর্কিত এক ব্যক্তিত্ব। এমনকি মার্কিন সরকারি আমলাতন্ত্র ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্যে গঠিত ‘ডজ’ (ডিওজিই) ব্যবহারের উদ্যোগকে নিজের ভুল হিসেবেও স্বীকার করেছেন তিনি। তা সত্ত্বেও এআই প্রযুক্তির গতিপথ নির্ধারণে তার প্রভাব অপরিসীম। অতীতে ইলেকট্রিক গাড়ি, রকেট কিংবা স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো জটিল প্রযুক্তিতে অন্যান্য প্রকৌশলীদের ভুল প্রমাণ করে তিনি সফল হয়েছেন। তাই মহাকাশে তার পরিকল্পিত ডাটা সেন্টারগুলো এআই-এর ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মাস্কের দাবি অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এআই-এর চিন্তাশক্তি মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে এবং ১০ বছরের মধ্যে তা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে বহুগুণে পেছনে ফেলবে। কোটি কোটি এআই-চালিত রোবট বাস্তব জগৎ শাসন করবে, যেখানে মানুষের পক্ষে আধিপত্য ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। মাস্কের মতে, তখন এআই মানুষের নির্দেশ সেভাবেই উপেক্ষা করবে, যেভাবে মানুষ শিম্পাঞ্জির নির্দেশ শোনে না। এই পরিস্থিতি এড়াতে তিনি আমেরিকা ও চীনের এআই পথিকৃৎদের যৌথভাবে মডেলগুলো যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে এআই-এর মধ্যে সত্যের প্রতি ভালোবাসা ও মানবতার কল্যাণের মানসিকতা তৈরি করা যায়।
এআই মডেলগুলোর ক্ষমতা যেভাবে দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে, তা ক্রমাগত আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সম্প্রতি ওপেনএআই-এর দুটি মডেল নিজেদের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ নজরদারি এড়িয়ে উন্মুক্ত ইন্টারনেটে প্রবেশ করে একটি বেঞ্চমার্কিং পরীক্ষায় প্রতারণা করেছে। মাস্ক আগে মানবজাতিকে এআই-এর পোষা কুকুর বা ‘ল্যাব্রাডোর’ হিসেবে দেখার আশঙ্কা করলেও এখন তিনি চরম উত্তেজনা ও আতঙ্কের দোলাচলে দুলছেন। বাস্তব প্রমাণের চেয়ে কেবল ‘দার্শনিক সিদ্ধান্ত’ থেকে তিনি এআইয়ের ভালো দিকটা দেখার চেষ্টা করছেন। তবে তার দেওয়া তদারকিবিহীন বা সংস্থাহীন নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবটি অত্যন্ত দুর্বল এবং তা মূলত তার মতো কয়েকজন ব্যক্তির হাতেই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ রাখার পক্ষপাতী।
গাণিতিকভাবে অসীম প্রাচুর্যের বিশ্বে সবকিছু বিনামূল্যে পাওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা অসম্ভব। ম্যানহাটনের পেন্টহাউস বা বিখ্যাত ‘মোনা লিসা’র মতো সম্পদের সরবরাহ অসীম নয়। এমনকি ৮.৩ বিলিয়ন মানুষের ক্ষুধা মেটানোর জন্য কাঁচামাল ও শক্তির সরবরাহও সীমিত। তাছাড়া অর্থ যখন vanish হয়ে যাবে, তখন এআই ও রোবট তৈরির ট্রিলিয়ন ডলারের মূলধন কোথা থেকে আসবে, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর মাস্কের কাছে নেই। এই রূপকথার যুগে পৌঁছানোর আগে লাখ লাখ মানুষের জীবন যখন বিপর্যস্ত হবে, তখন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়েও থেকে যায় বড় প্রশ্ন।
মাস্কের মতে, কম্পিউটার সব খেলায় জিতলেও মানুষ এখনো দাবা খেলে বা বাগান করে আনন্দ পায়। তবে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার মানসিক যন্ত্রণা মানুষকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। স্পেসএক্স-এর শেয়ারে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের একদিকে মাস্কের এআই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস রাখতে হচ্ছে, আবার অন্যদিকে টাকা জমানোর উপযোগিতাও মেনে নিতে হচ্ছে। সর্বোপরি, এআই তৈরির প্রতিযোগিতা যখন রকেটের গতিতে চলছে, তখন সমাজকে প্রস্তুত করার চিন্তাভাবনা অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে। মাস্কের এই নিয়ন্ত্রণহীন চরম হতাশা যাতে তদারকিহীন প্রযুক্তি তৈরির সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সেদিকে নীতিনির্ধারকদের কঠোর নজর দেওয়া প্রয়োজন।


























