ঢাকা ০৬:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী গ্রেপ্তার নিউ ইয়র্কে নামছে না নেতানিয়াহুর উড়োজাহাজ মূল্যস্ফীতির চাপে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করতে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের পাকিস্তান–চীন নতুন সীমান্ত চুক্তি নিয়ে ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া গুলশানে ককটেল বিস্ফোরণ মামলায় ১৫ আসামির ৩ দিনের রিমান্ড ক্ষমতার পাঁচ মাসে কেন হতাশ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, কী বলছে পরিস্থিতি মাদরাসা প্রধানদের ইআইআইএনভিত্তিক সিম কার্ড সচল রাখার নির্দেশ পাংশায় প্রবাসীর স্ত্রী রুনা হত্যায় প্রধান আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা কি অর্থনীতির শক্তি নাকি সংকটের লক্ষণ?

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৭:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাত যখন একের পর এক খারাপ খবরে জর্জরিত, ঠিক তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এলো এক চমকপ্রদ তথ্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি ২৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। একটি অলাভজনক ও নীতি-নির্ধারণী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশাল অংকের মুনাফা অর্জন স্বভাবতই অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এটি কি আমাদের অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে আর্থিক খাতের কোনো গভীর দুর্বলতা?

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট বা গ্রস মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এই সময়ে ব্যাংকের পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় হয়েছে ৮,৯৯৩ কোটি টাকা। ফলে নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬,০২৩ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২২,৬২০ কোটি টাকা। অর্জিত এই নিট মুনাফার প্রায় পুরোটাই, অর্থাৎ ২৫,৯৭৭ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ছয়টি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রণোদনা বোনাস হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিপুল আয়ের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দেশের বেশ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ও দৈনন্দিন লেনদেন সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রেপো, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ও বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় এসব দুর্বল ব্যাংককে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার বিপরীতে পাওয়া সুদ ছিল আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে এই আয় বৃদ্ধির বিষয়টি ব্যাংক খাতের চরম দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে; কারণ ব্যাংকগুলো সুশাসিত ও শক্তিশালী হলে এই জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হতো না।

দ্বিতীয়ত, তীব্র মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। বছরের অধিকাংশ সময় নীতি সুদহার উচ্চ থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থের বিপরীতে বেশি সুদ গুনতে হয়েছে। একই সাথে, রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে ও বৈদেশিক অর্থায়নের সংকটে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রচুর ঋণ নিতে হয়েছে। উচ্চ সুদহারের কারণে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ এবং সরাসরি সরকারি ঋণ থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোটা অঙ্কের সুদ পেয়েছে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি বড় অংশ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিদেশি সরকারি বন্ড এবং স্বল্পমেয়াদি নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করে ভালো রিটার্ন পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারেও এখন সুদহার বেশ চড়া।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ হলো মুদ্রানীতি প্রণয়ন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ, সরকারকে অর্থনৈতিক পরামর্শ দেওয়া, রিজার্ভ পরিচালনা, ব্যাংক নোট ইস্যু এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য মুনাফা অর্জন নয়, বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তাই লাভ-লোকসানের খতিয়ান দিয়ে এর সাফল্য পরিমাপ করা অবান্তর। অনেক সময় অর্থনীতিতে সংকট বাড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বাড়তে পারে। যেমন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়ালে কিংবা দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে বাজারে ডলার বিক্রি করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় বাড়ে। বিপরীতভাবে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে কম সুদে অর্থ দিলে কিংবা সংকটাপন্ন ব্যাংকের ঝুঁকি নিজের কাঁধে নিলে মুনাফা কমতে পারে, এমনকি লোকসানও হতে পারে। কিন্তু সেই লোকসান যদি আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে, তবে তাকে ব্যর্থতা বলা যায় না।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকে তাকালে এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার কোটি রুপি আয় করলেও তার পুরোটা সরকারকে দেয়নি। তারা প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি রুপি আপৎকালীন ঝুঁকি সঞ্চিতি বা কনটিনজেন্সি ফান্ডে স্থানান্তর করেছে এবং সরকারকে দিয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫৮৮ কোটি রুপি। রুপির মান ধরে রাখতে ডলার বিক্রি এবং বিদেশি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে তাদের এই আয় হয়েছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি রুপি নিট মুনাফা করে তার ৯৭ শতাংশই সরকারকে দিয়েছে। তবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি কমে আসায় নীতি সুদহার ২২ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ১১.৫ শতাংশে নামানো হয়, যার ফলে আগের বছরের চেয়ে তাদের মুনাফা ২০ শতাংশ কমে গেছে।

শ্রীলঙ্কার সেন্ট্রাল ব্যাংকের চিত্রটি আবার ভিন্ন। ২০২৫ সালে তাদের নিট মুনাফা আগের বছরের চেয়ে ২৯.৭ শতাংশ কমে ১৯৩.১ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে থাকায় সংকটকালীন উচ্চ সুদ ও বিনিময় হারের কৃত্রিম আয় কমে যাওয়াই ছিল এর কারণ। তবে মুনাফা কমলেও তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মোট সম্পদ বেড়েছে এবং ইকুইটি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুনাফার মাত্র ২২ শতাংশ সরকারকে দিয়ে বাকি অর্থ আগের লোকসান সমন্বয় ও নিজেদের মূলধন শক্তিশালী করতে রিজার্ভে জমা রেখেছে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেখানে প্রায় পুরো নিট মুনাফাই সরকারকে দিয়ে দিচ্ছে, সেখানে ভারত ও শ্রীলঙ্কা নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে বড় অংশ নিজেদের কাছে রেখে দিচ্ছে। বাংলাদেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেওয়া বিপুল ঋণের বিপরীতে ভবিষ্যৎ ক্ষতি সামলাতে পর্যাপ্ত সঞ্চিতি রাখা অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু সরকারের রাজস্ব ঘাটতির স্বস্তি দিতে প্রায় পুরো মুনাফাই কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও ঋণঝুঁকি বহনের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পরিশেষে বলা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিকভাবে সক্ষম থাকা জরুরি হলেও মুনাফা অর্জন এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে এলো, টাকার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ফিরল কি না, দুর্বল ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভরতা কমল কি না, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক জালিয়াতি রোধ করা গেল কি না এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কতটা নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য রাখা গেল—তার ওপর। মুনাফার অঙ্ক দিয়ে এই সাফল্য মাপা অসম্ভব।

এর মধ্যে ১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ কোটি রুপি কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কার নিট মুনাফা ছিল ১৯৩ দশমিক ১ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা কি অর্থনীতির শক্তি নাকি সংকটের লক্ষণ?

আপডেট সময় : ০৪:৪৭:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাত যখন একের পর এক খারাপ খবরে জর্জরিত, ঠিক তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এলো এক চমকপ্রদ তথ্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি ২৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। একটি অলাভজনক ও নীতি-নির্ধারণী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশাল অংকের মুনাফা অর্জন স্বভাবতই অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এটি কি আমাদের অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে আর্থিক খাতের কোনো গভীর দুর্বলতা?

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট বা গ্রস মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এই সময়ে ব্যাংকের পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় হয়েছে ৮,৯৯৩ কোটি টাকা। ফলে নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬,০২৩ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২২,৬২০ কোটি টাকা। অর্জিত এই নিট মুনাফার প্রায় পুরোটাই, অর্থাৎ ২৫,৯৭৭ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ছয়টি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রণোদনা বোনাস হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিপুল আয়ের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দেশের বেশ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ও দৈনন্দিন লেনদেন সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রেপো, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ও বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় এসব দুর্বল ব্যাংককে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার বিপরীতে পাওয়া সুদ ছিল আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে এই আয় বৃদ্ধির বিষয়টি ব্যাংক খাতের চরম দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে; কারণ ব্যাংকগুলো সুশাসিত ও শক্তিশালী হলে এই জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হতো না।

দ্বিতীয়ত, তীব্র মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। বছরের অধিকাংশ সময় নীতি সুদহার উচ্চ থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থের বিপরীতে বেশি সুদ গুনতে হয়েছে। একই সাথে, রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে ও বৈদেশিক অর্থায়নের সংকটে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রচুর ঋণ নিতে হয়েছে। উচ্চ সুদহারের কারণে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ এবং সরাসরি সরকারি ঋণ থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোটা অঙ্কের সুদ পেয়েছে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি বড় অংশ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিদেশি সরকারি বন্ড এবং স্বল্পমেয়াদি নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করে ভালো রিটার্ন পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারেও এখন সুদহার বেশ চড়া।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ হলো মুদ্রানীতি প্রণয়ন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ, সরকারকে অর্থনৈতিক পরামর্শ দেওয়া, রিজার্ভ পরিচালনা, ব্যাংক নোট ইস্যু এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য মুনাফা অর্জন নয়, বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তাই লাভ-লোকসানের খতিয়ান দিয়ে এর সাফল্য পরিমাপ করা অবান্তর। অনেক সময় অর্থনীতিতে সংকট বাড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বাড়তে পারে। যেমন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়ালে কিংবা দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে বাজারে ডলার বিক্রি করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় বাড়ে। বিপরীতভাবে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে কম সুদে অর্থ দিলে কিংবা সংকটাপন্ন ব্যাংকের ঝুঁকি নিজের কাঁধে নিলে মুনাফা কমতে পারে, এমনকি লোকসানও হতে পারে। কিন্তু সেই লোকসান যদি আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে, তবে তাকে ব্যর্থতা বলা যায় না।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকে তাকালে এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার কোটি রুপি আয় করলেও তার পুরোটা সরকারকে দেয়নি। তারা প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি রুপি আপৎকালীন ঝুঁকি সঞ্চিতি বা কনটিনজেন্সি ফান্ডে স্থানান্তর করেছে এবং সরকারকে দিয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫৮৮ কোটি রুপি। রুপির মান ধরে রাখতে ডলার বিক্রি এবং বিদেশি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে তাদের এই আয় হয়েছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি রুপি নিট মুনাফা করে তার ৯৭ শতাংশই সরকারকে দিয়েছে। তবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি কমে আসায় নীতি সুদহার ২২ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ১১.৫ শতাংশে নামানো হয়, যার ফলে আগের বছরের চেয়ে তাদের মুনাফা ২০ শতাংশ কমে গেছে।

শ্রীলঙ্কার সেন্ট্রাল ব্যাংকের চিত্রটি আবার ভিন্ন। ২০২৫ সালে তাদের নিট মুনাফা আগের বছরের চেয়ে ২৯.৭ শতাংশ কমে ১৯৩.১ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে থাকায় সংকটকালীন উচ্চ সুদ ও বিনিময় হারের কৃত্রিম আয় কমে যাওয়াই ছিল এর কারণ। তবে মুনাফা কমলেও তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মোট সম্পদ বেড়েছে এবং ইকুইটি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুনাফার মাত্র ২২ শতাংশ সরকারকে দিয়ে বাকি অর্থ আগের লোকসান সমন্বয় ও নিজেদের মূলধন শক্তিশালী করতে রিজার্ভে জমা রেখেছে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেখানে প্রায় পুরো নিট মুনাফাই সরকারকে দিয়ে দিচ্ছে, সেখানে ভারত ও শ্রীলঙ্কা নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে বড় অংশ নিজেদের কাছে রেখে দিচ্ছে। বাংলাদেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেওয়া বিপুল ঋণের বিপরীতে ভবিষ্যৎ ক্ষতি সামলাতে পর্যাপ্ত সঞ্চিতি রাখা অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু সরকারের রাজস্ব ঘাটতির স্বস্তি দিতে প্রায় পুরো মুনাফাই কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও ঋণঝুঁকি বহনের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পরিশেষে বলা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিকভাবে সক্ষম থাকা জরুরি হলেও মুনাফা অর্জন এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে এলো, টাকার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ফিরল কি না, দুর্বল ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভরতা কমল কি না, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক জালিয়াতি রোধ করা গেল কি না এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কতটা নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য রাখা গেল—তার ওপর। মুনাফার অঙ্ক দিয়ে এই সাফল্য মাপা অসম্ভব।

এর মধ্যে ১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ কোটি রুপি কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কার নিট মুনাফা ছিল ১৯৩ দশমিক ১ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo