ভারত ও বাংলাদেশের নতুন সম্পর্কের সমীকরণ ও কৌশল
- আপডেট সময় : ০৭:৪৭:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে, তবে প্রতিটি সুযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে লাভ ও দায়বদ্ধতার হিসাব করা জরুরি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পটভূমিতে সরকারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার। ২০১৩ সালের মার্চে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরকালে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি হরতাল ও নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে বাতিল হয়ে যায়। ৪ মার্চ ভারতের দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ সাংবাদিক স্বরাজ থাপা ‘প্রণব মুখার্জি ভিজিট রানস ইনটু বাংলাদেশ টারময়েল, খালেদা জিয়া ক্যানসেলস মিট’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি করেছিলেন, যা দিল্লিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। ১৩ বছর পর সেই ঘটনার বিচার নয়, বরং বর্তমান প্রেক্ষাপটটি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাই প্রশ্ন কেবল তারেক রহমানের ভারত সফর নয়, বরং বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে যাবে, তা-ই এখন বড় প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দুই দেশই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী, কিন্তু শর্ত নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। ২১ আগস্ট রয়টার্স প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহকে উদ্ধৃত করে জানায়, তারেক রহমানের ভারত সফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। ২২ আগস্ট বাসসের প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক দরকার, তবে জাতীয় স্বার্থ বাদ দিয়ে নয়। ২৩ আগস্ট দিল্লি থেকেও একই ধরনের বার্তা আসে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ‘দিল্লি-ঢাকা চিল: জয়শঙ্কর ফ্ল্যাগস মিউচুয়াল ইন্টারেস্টস, কমন গ্রাউন্ড’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়, প্রতিবেশীরা শুধু ভারতের স্বার্থ দেখবে তা ঠিক নয়, ভারতকেও তাদের স্বার্থ বুঝতে হবে। অর্থাৎ, সম্পর্ক থাকবে কি না তা নয়, বরং দুই দেশের চাওয়া পাওয়ার সমন্বয় করাই এখন ২০২৬ সালের নতুন হিসাবের শুরু।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব ভারতকে যেমন বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও ভারত অপরিহার্য। তবে চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ইমরান আহমেদ ২৩ জুলাই ২০২৬ ‘রিক্যালিব্রেটিং ফরেন পলিসি: ইমপ্লিকেশনস অব তারেক রহমানস চায়না ভিজিট’ শিরোনামের বিশ্লেষণে একে বাংলাদেশের ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ হিসেবে দেখেছেন। এর অর্থ হলো, কোনো এক শক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর না করে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ দেখা। তবে তাঁর সতর্কতা হলো, নতুন সম্পর্ক যেন আবার নতুন নির্ভরতা তৈরি না করে।
তারেক রহমানের জন্য শেখ হাসিনার বিষয়টি একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এটি কেবল একটি বিরোধ নয়, বরং জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। ১৬ আগস্ট রয়টার্স ‘বাংলাদেশ সেজ বেটার এনভায়রনমেন্ট নিডেড ফর ইন্ডিয়া ভিজিট অ্যামিড রিফট ওভার আউস্টেড লিডার’ শিরোনামে জানায়, ভারত বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পেয়েছে এবং নিজের আইনি কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি দেখছে। ২১ আগস্ট রয়টার্স জানায়, ঢাকা ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে। ২২ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি নতুন কোনো শর্ত নয়; এটি দুই দেশের আলোচনার অংশ এবং মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। ২৩ আগস্ট জয়শঙ্করকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি উত্তর দেননি। বাংলাদেশের জন্য এখানে ভারসাম্য দরকার; শেখ হাসিনা ইস্যু পুরোপুরি বাদ দিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি পুরো ভারতনীতিকে এই একটি প্রশ্নে আটকে রাখলে তিস্তা, গঙ্গা, সীমান্ত, বাণিজ্য ও ভিসার মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহামদ মুইজ্জুর অভিজ্ঞতা এখানে সীমিতভাবে কাজে লাগে। ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারের পর ক্ষমতায় এসে তিনি আলোচনার মাধ্যমে সামরিক সদস্যদের জায়গায় বেসামরিক প্রযুক্তিবিদ রাখার ব্যবস্থা করেন এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে দিল্লি সফর করেন। বাংলাদেশের জন্য কঠিন কাজ হলো বিচারের দাবি, ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থ—তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামলানো। এছাড়া, বড় প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও সতর্কতার দাবি রাখে। ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও, এর মাধ্যমে কী দায়ভার নিতে হবে তা বিবেচ্য। ২৩ আগস্ট নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, বাংলাদেশ এতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে, তবে সিদ্ধান্ত হবে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ ধারণা অনুযায়ী, জোটে ঢোকার আগে বের হওয়ার দরজাও দেখতে হবে। সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের পরীক্ষা হলো শত্রু নয়, নতুন বন্ধু তৈরি করা এবং এমন কোনো দায় না নেওয়া যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের হাত বেঁধে দেবে।




























