বিটিআরসি কর্মকর্তাদের ৬০ শতাংশ ভাতা প্রস্তাব নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ০৭:৫৫:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতি মাসে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে ‘রেগুলেটরি ভাতা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় এ বিষয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কর্মকর্তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ভূমিকা, টেলিযোগাযোগ খাত নিয়ন্ত্রণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব এবং চাকরি ছাড়ার ছয় মাস পর্যন্ত অন্য কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণেই এই ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে ভাতা দেওয়ার এই যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) রেক্টর ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বিটিআরসির এই যুক্তি সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের রাজস্ব আদায় করা বিটিআরসির কাজেরই অংশ, যার জন্য তারা চাকরিতে এসেছেন। তাই রাজস্ব আদায় বেশি করার অজুহাতে বাড়তি কোনো দাবি করা যুক্তিসংগত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কমিশনের কাজের মূল্যায়ন শুধু রাজস্বের অঙ্ক দিয়ে করা যায় না; বরং সেবার মান, গ্রাহকের অভিযোগ, অপারেটরদের লাইসেন্সের শর্ত মানা, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোও এর সঙ্গে যুক্ত।
বিটিআরসির অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ২৫ বছরে সংস্থাটি মোট ৮৫ হাজার ৭৭৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের রাজস্ব আয়-সংক্রান্ত বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিটিআরসির জন্য ৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরের জন্য ৭ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিটিআরসি কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকারের পাওনা রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে মাত্র।
বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতে সরকারের বিপুল অঙ্কের পাওনা আদায় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে সংসদে দেওয়া তথ্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, দেশের চার মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে ৬ হাজার ১০১ কোটি ৮২ লাখ, টেলিটকের কাছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি, রবির কাছে ৬১৫ কোটি এবং বাংলালিংকের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এছাড়া ২৪টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
বিটিআরসির নথিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য প্রণোদনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কর্মকর্তাদের ইনসেনটিভ বোনাস এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ২০ শতাংশ ঝুঁকি ভাতার উদাহরণ টেনেছে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, চাকরি ছাড়ার পর ছয় মাস এই খাতে কাজের সুযোগ না থাকায় কর্মকর্তাদের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি জানান, টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিদিন দ্রুত পরিবর্তন আসায় ছয় মাস বাইরে থাকলে কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা পুরোনো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২১ বছরে বিভিন্ন ফি ও জরিমানা বাবদ ১ হাজার ২১৫ কোটি টাকার বেশি আদায় হয়েছে, যেখানে এই সময়ে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬১৭ কোটি টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার চাইলে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ থেকে এই ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে।



























