খ্যাঁকশিয়াল কেবল মুরগিচোর নয়, কৃষির অতন্দ্র প্রহরী
- আপডেট সময় : ০১:১৫:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

লোকালয়ে খ্যাঁকশিয়ালকে সাধারণত ‘মুরগিচোর’ হিসেবেই চেনে মানুষ। তবে নতুন একটি গবেষণা বলছে, এই প্রাণীটি কেবল ক্ষতিকর নয়, বরং আমাদের কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় বাংলা খ্যাঁকশিয়াল বা ‘বেঙ্গল ফক্স’ নিয়ে দীর্ঘ তিন মাস ধরে চালানো এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই প্রাণীর জীবনযাপন, সামাজিক আচরণ এবং পরিবেশগত অবদানের নানা অজানা তথ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একদল গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞের যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার একটি কবরস্থানে খ্যাঁকশিয়ালের গর্তকে কেন্দ্র করে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা-ট্র্যাপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ১২ ঘণ্টা ১৮ মিনিটের মোট ৪ হাজার ৫০০টির বেশি ভিডিও ক্লিপ বিশ্লেষণ করে তৈরি এই গবেষণাটি চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ব্রিটিশ ইকোলজিক্যাল সোসাইটি ও উইলি প্রকাশনার ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোল্যুশন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ‘ডেন-সাইট বিহেভিয়ার অব বেঙ্গল ফক্স রিভিলস পারসিস্টেন্ট ইউজ, সোশ্যাল ইন্টারেকশনস, অ্যান্ড কো-এক্সিস্টেনস IN শেয়ারড স্পেসেস’ শীর্ষক এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসির আকাশ, গবেষক মো. রোকনুজ্জামান, সুলতান আহমেদ, মোহাম্মদ সামিউল আলম এবং ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ম্যাক্সিমিলিয়ান অ্যালেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, খ্যাঁকশিয়াল অত্যন্ত দক্ষ শিকারি এবং এরা মূলত সুযোগসন্ধানী খাদক। ৫৪০টি ক্যামেরা-ট্র্যাপ ভিডিওতে খ্যাঁকশিয়ালদের নানা ধরনের খাবার খেতে দেখা গেছে। তাদের খাবারের তালিকায় পোকামাকড় (১৯ শতাংশ), ছোট পাখি (১৮ শতাংশ) এবং ইঁদুর (৮ শতাংশ) অন্যতম। বিশেষ করে শাবক লালন-পালনের সময় তারা ভারী শিকার পছন্দ করে। উইপোকার ঝাঁক যখন মাটি থেকে বের হয়, তখন শাবকেরা তা আনন্দের সাথে খায়। তবে এই গবেষণায় খ্যাঁকশিয়ালের সাপ বা মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খাওয়ার কোনো প্রমাণ মেলেনি।
খ্যাঁকশিয়াল সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করলেও প্রজনন ও শাবক লালন-পালনের সময় তারা জোড়ায় থাকে এবং চমৎকার সামাজিক আচরণ প্রদর্শন করে। গবেষণায় তাদের ১৬ ধরনের আচরণের মধ্যে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আচরণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এ রকম ৪২৫টি ভিডিও ক্লিপের মধ্যে শাবকদের নিজেদের ও বাবা-মায়ের সঙ্গে খেলাধুলা করাই ছিল সবচেয়ে বেশি (৩২৭টি), ৫০টি ভিডিও ক্লিপে একে অপরকে অভিবাদন জানানোর দৃশ্য দেখা গেছে (লেজ নাড়ানো, শরীর ও মুখ শুঁকা, নিচু স্বরে শব্দ করা)। এছাড়া পারস্পরিক লোম পরিষ্কার করে দেওয়া এবং মা শিয়ালের দুধ খাওয়ানোও অন্যতম। একটি গর্তে সর্বোচ্চ ৬টি পর্যন্ত খ্যাঁকশিয়াল একসঙ্গে বসবাস করতে দেখা গেছে।
গবেষণায় খ্যাঁকশিয়ালের আস্তানার আশপাশে মানুষের চলাচল ও অন্যান্য প্রাণীর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গর্তের মাত্র ২০ মিটার দূরে পাকা রাস্তা থাকা সত্ত্বেও মানুষের স্বাভাবিক চলাচল তাদের বিচলিত করেনি। তবে বাংলা গুইসাপের সাথে খ্যাঁকশিয়ালের এক ধরনের ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ চলতে দেখা গেছে। ৪৪৭টি ভিডিও ক্লিপে এদের একসঙ্গে দেখা গেছে, যার মধ্যে ১৬টিতে গুইসাপকে দেখামাত্র খ্যাঁকশিয়াল তেড়ে গেছে। মূলত গুইসাপ শিয়ালের শাবক শিকার করে এবং তাদের পরিত্যক্ত গর্ত ব্যবহারের চেষ্টা করে বলে এই দুই প্রজাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এছাড়া গর্তের আশপাশে পাতিশিয়াল, কুকুর ও মানুষের আনাগোনাও রেকর্ড করা হয়েছে। বিপদ এড়াতে খ্যাঁকশিয়ালগুলো সাধারণত গোধূলি (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা) এবং ভোরে (ভোর ৪টা ৩০ মিনিট থেকে ৬টা ৩০ মিনিট) বেশি সক্রিয় থাকে, যখন মানুষ বা বড় শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি কম থাকে।
বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী আদনান আজাদ জানান, খ্যাঁকশিয়াল অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম প্রাণী এবং মানুষের ক্ষতি না করলে তারা লোকালয়ের আশপাশেই স্বাভাবিক জীবনচক্র বজায় রাখতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, এই গবেষণা প্রমাণ করে যে যথাযথ নিরাপত্তা পেলে খ্যাঁকশিয়াল মানুষের সহাবস্থানেই শান্তিতে থাকতে পারে। একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের শিকল ভেঙে যায়।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের উপদ্রবের কারণে এই প্রাণীটির অস্তিত্ব হুমকি মুখে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) বাংলাদেশের লাল তালিকায় এই প্রজাতিটি ‘বিপন্ন’ বা ‘বিপদাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং বন্যার কারণে তাদের আবাসস্থল ও মাটির নিচের গর্তগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুনতাসির আকাশ বলেন, আমরা সাধারণত কোনো প্রাণী বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিই। খ্যাঁকশিয়ালের মতো ছোট মাংসাশী প্রাণীদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না, অথচ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি বাড়ছে, যা দমনে খ্যাঁকশিয়াল ও সাপের মতো প্রাকৃতিক শিকারি অত্যন্ত জরুরি। এদের অভাবে ফসলের ক্ষতি বাড়ছে এবং কৃষকদের অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। উপপ্রধান বন সংরক্ষক রাকিবুল হাসান মুকুল জানান, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খ্যাঁকশিয়ালের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া প্রকৃতির জন্য উদ্বেগজনক। বন বিভাগ বন্য প্রাণী রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। গ্রামীণ ঝোপঝাড়, কবরস্থান ও পতিত জমি রক্ষা করে এই উপকারী প্রাণীটিকে টিকিয়ে রাখা এখন সময়ের দাবি।





























