সীতাকুণ্ডে জাহাজ কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু
- আপডেট সময় : ০৬:১৭:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আজ শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল সেটি এলএনজি পরিবহন করত। নিহত আট শ্রমিকের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া গেছে—সানি জলদাস, পলাশ জলদাস, হাবিবুর রহমান, মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন। তাঁদের মধ্যে মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন আপন ভাই। নিহতরা সবাই ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক শুভ জলদাস জানান, জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। শুক্রবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ফোরম্যান সাত-আটজন শ্রমিক ও কাটারম্যান নিয়ে ট্যাংকের চারপাশ গোল করে কাটেন। প্রায় ১০ মিনিট পর গর্তটি পুরোপুরি খোলার জন্য সেখানে গেলে প্রথমে দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাঁদের উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুজন শ্রমিক গ্যাসে আক্রান্ত হন। এরপর কাটিং ফোরম্যান তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরিস্থিতি দেখতে মাস্ক পরে এগিয়ে যাওয়া একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শুভ জানান, তিনি নিজেও দূর থেকে হুক লাগিয়ে একজনকে টেনে তোলার চেষ্টা করার সময় গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে জাহাজের বাইরে কাদামাটিতে বেহুঁশ হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ অচেতন থাকার পর ক্রেন অপারেটর তাঁকে টেনে তোলেন।
কারখানার শ্রমিক মো. রফিক অভিযোগ করেন, অচেতন হয়ে পড়া শ্রমিকদের সবাই ঘটনাস্থলে মারা যাননি। তিনি বলেন, পলাশ জলদাসকে উদ্ধারের পরও তিনি জীবিত ছিলেন। কিন্তু তখন কারখানার ভেতরে কোনো অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল না। সময়মতো অক্সিজেন দেওয়া গেলে এত প্রাণহানি হতো না। দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার ফটকের পাশে পলাশ জলদাস ও সানি জলদাশের লাশ পড়ে রয়েছে এবং স্বজনেরা কান্নাকাটি করছেন। ফায়ার সার্ভিসকে এক শ্রমিককে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানান, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ৯৯৯-এ কল পেয়ে কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে যায় এবং হতাহতদের উদ্ধার করে। তিনি জানান, এলএনজি জাহাজগুলো কাটার আগে গ্যাসমুক্ত করতে হয়। কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকতে পারে, যা অত্যন্ত বিষাক্ত। কারখানা কর্তৃপক্ষ ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল খুবই দুর্বল।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইডসহ অন্যান্য গ্যাসের মিশ্রণে একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তিনি জানান, এলএনজি পরিবাহী জাহাজের কার্গো গ্যাস ট্যাংক গ্যাসমুক্ত কি না, তা দেখার দায়িত্ব বিস্ফোরক অধিদপ্তরের। তবে জাহাজের ছোট ছোট চেম্বার ট্যাংকগুলোতে থাকা হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া বা কার্বন মনোক্সাইডের মতো গ্যাস থেকে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে, তবে কোন গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছেন তা নিশ্চিত হতে সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ টিম ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের খবর দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন জানান, তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারখানার মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিন বেলা দুইটার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দাবি করেন, সেফটি বিভাগের লোকজন নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত সব শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারকে বাংলাদেশের আইন অনুসারে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।



























