জ্যোতির্বিজ্ঞানকে স্বাধীন শাস্ত্র হিসেবে গড়ে তোলায় মুসলিম মনীষীদের অবদান
- আপডেট সময় : ০৬:০৫:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে

ইসলামি সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিজ্ঞান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। দর্শন ও পদার্থবিদ্যার সনাতন প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে এই শাস্ত্রের অনন্য এক রূপান্তর ঘটেছিল। এ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের পেছনে ইবনে সিনা, ইমাম গাজ্জালি, নাসিরুদ্দিন তুসি, আল-জুরজানি এবং আলী কুশজির মতো প্রখ্যাত মুসলিম মনীষীদের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মারাগা ও সমরকন্দের মতো বিখ্যাত গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলো এই জ্ঞানচর্চাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
ইসলামি সমাজে জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা কেবল তাত্ত্বিক বা রাজদরবারের আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নামাজের সময় নির্ধারণ, কিবলার সঠিক দিক নির্ণয়, পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা এবং হিজরি বর্ষপঞ্জি তৈরির মতো অতিপ্রয়োজনীয় ব্যবহারিক কাজে এর সরাসরি উপযোগিতা ছিল। ফলে মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোতেও এই বিজ্ঞানের ব্যাপক চর্চা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মুসলিম বিজ্ঞানীর কাছে আকাশ পর্যবেক্ষণ ছিল মূলত স্রষ্টার সৃষ্টিজগতের নিখুঁত শৃঙ্খলা ও অপার নিদর্শন বোঝার একটি অন্যতম মাধ্যম।
এই শাস্ত্রীয় বিবর্তনের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ইবনে সিনা। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণভাবে জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে পৃথক করেন এবং পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে একে একটি স্বাধীন শাখা হিসেবে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন। অবশ্য তাঁর সময়কার জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চা তখনও অ্যারিস্টটলের মহাবিশ্ব ও প্রকৃতিবিদ্যার ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ইমাম গাজ্জালি এবং আদুদুদ্দিন আল-ইজি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক ও ব্যবহারিক গুরুত্বকে স্বীকার করলেও তাঁরা মনে করতেন, আকাশের গতিবিধি নির্ভুলভাবে গণনা করার ক্ষমতা থাকলেও মহাবিশ্বের চূড়ান্ত বাস্তবতা বা সৃষ্টিজগতের প্রকৃত স্বরূপ নির্ধারণের ক্ষমতা এই শাস্ত্রের নেই।
মারাগা জ্যোতির্বিজ্ঞান বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নাসিরুদ্দিন তুসি এই বিজ্ঞানকে আরও শক্তিশালী গাণিতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হন, যদিও তিনিও কিছু ক্ষেত্রে অ্যারিস্টটলীয় প্রকৃতিদর্শনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এরপর সৈয়দ শরিফ আল-জুরজানি এই ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। তিনি প্রস্তাব করেন যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক মডেলগুলো কেবল হিসাবের সুবিধাজনক মাধ্যম নয়, বরং বাস্তব জগতের সঙ্গে এগুলোর গভীর সংযোগ রয়েছে। তাঁর উপস্থাপিত ‘নাফস আল-আমর’ (মানুষের চিন্তার বাইরে বিদ্যমান বাস্তব অবস্থা) ধারণাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনাকে বাস্তব জগতের সত্য জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে。
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারার চূড়ান্ত রূপান্তর ঘটে আলী কুশজির হাত ধরে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, জ্যোতির্বিজ্ঞান কেবল হিসাব-নিকাশের কোনো কৌশল নয়, বরং এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রকৃত শৃঙ্খলা ও সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব। কুশজির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল, তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে অ্যারিস্টটলীয় পদার্থবিদ্যা ও অধিবিদ্যার কঠোর প্রাচীন কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করেন। আশআরী মতবাদের কার্যকারণ সম্পর্কের ধারণাকে ভিত্তি করে তিনি দেখান যে, প্রকৃতিতে কোনো কারণ নিজে থেকে অপরিহার্য নয়। ফলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ, অন্তর্দৃষ্টি ও গণিতের সমন্বয়ে প্রকৃতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হয় এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান একটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে।





























