ইসলামি শরিয়তে প্রচলিত ব্যাংকিং সুদ কেন রিবা হিসেবে নিষিদ্ধ
- আপডেট সময় : ০৭:৫৪:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে

ইসলামি শরিয়তে রিবার ধরণ ও প্রকৃতি অত্যন্ত স্পষ্ট। যুগে যুগে ফকিহগণ এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন এবং যদিও বিভিন্ন সময়ে রিবার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে, তথাপি পদ্ধতির এই পরিবর্তনের কারণে রিবার মূল সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়নি। বর্তমান আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষ টাকা জমা রাখে এবং বিনিময়ে ব্যাংক সুদ প্রদান করে। আবার ব্যাংক সেই টাকা অন্যদের ঋণ দিয়ে সুদ গ্রহণ করে। এক পক্ষ থেকে সুদ গ্রহণ করে অন্য পক্ষকে পরিশোধ করার এই প্রক্রিয়াটি যদিও প্রাচীন পদ্ধতির মতো হুবহু এক নয়, তবুও এতে রিবার মূল উপাদান বিদ্যমান। এই কারণে বর্তমান সময়ের ফকিহগণ প্রচলিত ব্যাংকিং সুদকে ইসলামে নিষিদ্ধ রিবা হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন। যদিও গুটি কয়েক মানুষ ব্যাংকিং সুদ ও শরিয়তের রিবা এক নয় বলে দাবি করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাদের এই মত গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় শরিয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ১৪০৬ হিজরি বা ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি, জেদ্দা তাদের দশম সেমিনারে সিদ্ধান্ত নেয় যে, মেয়াদান্তে ঋণের ওপর অতিরিক্ত গ্রহণ বা শুরু থেকেই অতিরিক্ত আদান-প্রদান সরাসরি হারাম রিবা। ১৪১০ হিজরি বা ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামি ফিকহ একাডেমি, ভারত তাদের দ্বিতীয় সেমিনারে প্রচলিত ব্যাংকিং সুদকে রিবা হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়া মিশরের আল আজহারের ইসলামিক রিসার্চ একাডেমি ১৩৮৫ হিজরি বা ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের কনফারেন্সে ঘোষণা দেয় যে, কমার্শিয়াল লোন বা প্রাইভেট লোন নির্বিশেষে ঋণের ওপর অতিরিক্ত আদান-প্রদান রিবা।
সৌদি আরবের ইসলামি ফিকহ একাডেমি ১৪০৮ হিজরি বা ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্যাংকিং সুদ বৈধ হওয়ার দাবি খণ্ডন করে। এর আগে ১৪০৬ হিজরি বা ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তারা মুসলিমদের জন্য সুদি ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে লেনদেন করাকে হারাম বলে ফতোয়া দেয়। তিনি তার একাধিক ফতোয়ায় স্পষ্ট বলেছেন, ‘প্রচলিত ব্যাংকে অর্থ জমা করে অতিরিক্ত আদান-প্রদান রিবা।’ (ফতোয়া : ১২৫৪, ১২৫৫)। কুয়েতে ১৯৮৩ সালে অনুষ্ঠিত ইসলামি ব্যাংকিংয়ের দ্বিতীয় কনফারেন্সেও প্রচলিত অর্থনীতির ইন্টারেস্টকে শরিয়তের দৃষ্টিতে রিবা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর রেজুলেশনেও স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়, ‘প্রচলিত অর্থনীতিতে ইন্টারেস্ট যাকে বলা হয়, সেটি শরিয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্ট রিবা।’ (ফাওয়ায়িদুল বুনুক হিয়ার রিবাল হারাম : ১৪৩)। এছাড়া ১৯৮৮ সালে আল আজহার ফতোয়া কমিটি সরকারি ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে অংশগ্রহণ করাকে সুদভিত্তিক ঋণের কারণে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে।
৩. ইসলামিক রিসার্চ একাডেমি (Islamic Research Academy, Al Ayhar Al Sharif) মিশরের উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় শরিয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান। মিশর আল আজহার বিশ্বািবদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী তারা সমকালীন বিভিন্ন শরিয়া ইস্যুতে শরিয়া সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকে। ১৩৮৫ হিজরি মোতাবেক ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তাদের উদ্যোগে মিশরে শরিয়া স্কলারগণের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দীর্ঘ আলোচনার পর তাদের শরিয়া রেজুলেশনে স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়, ‘প্রচলিত সুদি ব্যাংকিং-এ ঋণের ওপর অতিরিক্ত আদান-প্রদান রিবা। এ ক্ষেত্রে কমার্শিয়াল লোন ও প্রাইভেট লোনের মধ্যে কোনো তফাৎ হবে না।’ (ফিকহুন নাওয়াজেল : ১৪৫)।
এ-বিষয়ক সম্মিলিত শরিয়া সিদ্ধান্তে তা উল্লেখ করা হয়। (সেমিনার : ১০, সিদ্ধান্ত : ৫, একাডেমির সিদ্ধান্তগুলো : ২৪১)। এর আগে ১৪০৬ হিজরি মোতাবেক ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে একাডেমি বিশ্বব্যাপী সুদি ব্যাংকিংয়ের বিস্তৃতি ও এগুলোর সঙ্গে মুসলিমদের লেনদেন-বিষয়ক এক সেমিনারের আয়োজন করে। উক্ত সেমিনারের শরিয়া রেজুলেশনেও স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, ‘ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে লেনদেন করার সুযোগ থাকলে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য সুদি ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে লেনদেন করা হারাম। চাই তা অভ্যন্তরীণ বা বহিরাগত কাজে হোক।’ (ফাওয়ায়িদুল বুনুক হিয়ার রিবাল হারাম : ১৩৭)।





























