মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের যৌথ সামরিক শক্তি কত?
- আপডেট সময় : ১১:৩৮:১৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। গালফ অঞ্চলে ইরানের সরাসরি হামলা এবং তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলোর তৎপরতা পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তিকে পুনরায় সুসংহত করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অতিদ্রুত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক, যা এই ত্রিপক্ষীয় জোটের সামরিক সক্ষমতাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
গত ৭ই আগস্ট সৌদির পবিত্র নগরী মক্কায় এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এতে অংশ নেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স ২০২৬-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই তিন দেশের সম্মিলিত বার্ষিক সামরিক ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ৪৪০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বাজেট সৌদি আরবের, যার পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৩৯০ কোটি ডলার। এছাড়া তুরস্কের বাজেট ৫ হাজার ১৪০ কোটি ডলার এবং পাকিস্তানের ৯১০ কোটি ডলার।
সামরিক জনবলের দিক থেকেও এই জোট অত্যন্ত শক্তিশালী। তিন দেশের নিয়মিত সক্রিয় সেনাসদস্যের মোট সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সেনা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান। পাশাপাশি তুরস্কের ৪ লাখ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের ২ লাখ ৪৭ হাজার নিয়মিত সেনা রয়েছে। আকাশসীমা সুরক্ষায় এই তিন দেশের যৌথ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মোট ৩ হাজার ৪১৫টি সামরিক উড়োজাহাজ, যার মধ্যে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও প্রশিক্ষণ বিমান অন্তর্ভুক্ত। একক দেশ হিসেবে পাকিস্তানের হাতে রয়েছে ১ হাজার ৩৯৭টি, তুরস্কের ১ হাজার ১০১টি এবং সৌদি আরবের রয়েছে ৯১৭টি সামরিক বিমান।
স্থলভাগে এই তিন দেশের সম্মিলিত বাহিনীর অধীনে রয়েছে ৬ হাজার ৪৬টি ট্যাংক এবং ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান। ট্যাংক বহরে পাকিস্তানের সংখ্যা ২ হাজার can৬৭৭টি, তুরস্কের ২ হাজার ২৮৪টি এবং সৌদি আরবের রয়েছে ১ হাজার ৮৫টি। সমুদ্রসীমায় জোটের সম্মিলিত নৌবহরে রয়েছে মোট ৩৪৪টি যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান, যার মধ্যে ৩৩টি ফ্রিগেট, ২৪টি কর্ভেট এবং ২২টি সাবমেরিন রয়েছে। নৌ শক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা তুরস্কের রয়েছে ১৯২টি নৌযান, পাকিস্তানের ১২০টি এবং সৌদি আরবের রয়েছে ৩২টি। পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান, ন্যাটো সদস্য তুরস্কের ড্রোন ও আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি এবং সৌদি আরবের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সমন্বয় এই জোটকে অঞ্চলের অন্যতম পরাশক্তিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, সৌদি আরবের ওপর কোনো ধরনের অযাচিত আগ্রাসন বা ইয়েমেন সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়লে নিশ্চিতভাবেই মক্কা চুক্তি কার্যকর করা হবে। এতদিন পর্যন্ত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বজায় রাখার স্বার্থে তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। তবে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতিদের নতুন দফার হামলা পরিস্থিতিকে চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
গাল্ফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের গবেষক আব্দুল আজিজ আলঘাশিয়ান জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের আক্রমণ ও উসকানি এই সামরিক জোটের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। তাঁর মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের ফাঁকা কথার ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে’ এবার একটি বাস্তব সামরিক রূপ দিতে চলেছে, যা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত সংকটময় ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়।




























