প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার সমীকরণ
- আপডেট সময় : ১২:৫০:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন সমীকরণ ও জাতীয় স্বার্থের নানা দিক সামনে আসছে। রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনার জাঁকজমক নয়, বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্যে সুবিচার এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তের মর্যাদাই হবে এই সম্পর্কের প্রকৃত মাপকাঠি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পর্যালোচনার মূল লক্ষ্য হলো দেশের জন্য ক্ষতিকর শর্তগুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করা, নির্বিচারে সব চুক্তি বাতিল করা নয়। ভারতের পক্ষ থেকে সফরের আমন্ত্রণ বহাল থাকলেও এখনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হয়নি। ভারতের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম, যা দেশটির সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। প্রায় ৪,১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর, ট্রানজিট এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় দিল্লি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্বাধীন ও বহুমুখী কূটনীতি দিল্লির চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বড় অঙ্গীকার এসেছে। এছাড়া পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নও regional সমীকরণে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে ভারতের সংসদীয় কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ঢাকাকে তার নিজস্ব প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে সহযোগী বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে। তবে এই বহুমুখীকরণ যেন আবার নতুন কোনো একক নির্ভরতায় রূপ না নেয়, সেদিকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। এছাড়া তিস্তা চুক্তি এখনো অনিষ্পন্ন এবং বেশিরভাগ অভিন্ন নদীর স্থায়ী বণ্টনব্যবস্থা নেই। সীমান্তে প্রতিনিয়ত প্রাণহানি, অবৈধ পারাপার, 'পুশ-ইন' অভিযোগ এবং ভিসা-সংকট দুই দেশের জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতার আশ্বাস তখনই অর্থবহ হবে যখন সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
বর্তমানে দুই দেশের আস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই আবেদনটি আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনাধীন রয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে নানা অজুহাতে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে মদদ দেওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে না। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ পরিহার করে কঠোর হিসাব-নিকাশ প্রয়োজন। আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মূল্য ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে সরকারি পর্যালোচনা কমিটি ইতিমধ্যেই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সালিশ বা আইনি প্রতিকারের পথ খোলা রেখেই দরকষাকষির মাধ্যমে যৌক্তিক শর্ত নিশ্চিত করতে হবে।
আসন্ন সফরটিকে সফল করতে হলে গঙ্গা চুক্তি, তিস্তার রোডম্যাপ, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, আদানি চুক্তি সংশোধন এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো বিষয়গুলোকে সুস্পষ্ট আলোচ্যসূচিতে রাখতে হবে। ভৌগোলিক কারণে প্রতিবেশী এই দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ বন্ধুত্ব ও ন্যায্য সহযোগিতার ভিত্তিতে। ভারতের আমন্ত্রণের পেছনে কৌশল বা সদিচ্ছা যা-ই থাকুক না কেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের মূল ভিত্তি হতে হবে জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা।




























