পাকিস্তানে অনলাইনে যৌন নিপীড়নের ফাঁদে ১৫ লাখ শিশু
- আপডেট সময় : ০৮:২২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

অনলাইনে কম্পিউটার গেম খেলার সময় এক অপরিচিত ব্যক্তির খপ্পরে পড়েছিল পাকিস্তানি কিশোরী জারা শাহ (ছদ্মনাম)। সাধারণ কথোপকথন দিয়ে শুরু হওয়া সেই আলাপ যে তাকে ভয়াবহ অনলাইন যৌন নিপীড়নের দিকে ঠেলে দেবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। জারা জানায়, শুরুতে বন্ধুসুলভ আচরণ করলেও পরে ওই ব্যক্তি তার নগ্ন ছবি দাবি করে। রাজি না হওয়ায় সে হুমকি দেয় যে, অনলাইনে তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে সব জানিয়ে দেবে। এই আতঙ্ক ও সামাজিক অপমানের ভয়ে জারা মুখ খোলার সাহস পায়নি, কারণ সে ভয় পায় যে বিষয়টি জানাজানি হলে তার পড়াশোনা ও চলাফেরা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানে গত এক বছরে প্রায় ১৫ লাখ শিশু অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ভুক্তভোগী শিশুদের ৮৫ শতাংশের ক্ষেত্রেই নিপীড়ক ছিলেন তাদের পরিচিত কেউ। ইউনিসেফের বৈশ্বিক প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড্যানিয়েল কারডেফেল্ট জানান, বন্ধুত্বের আড়ালে, গেম খেলার সময় আলাপ, উপহার বা প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে অপরাধীরা এই নিপীড়ন শুরু করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে অপরাধীরা অনেক সময় মাসের পর মাস সময় নেয়। লোকলজ্জা ও পরিবারের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে পাকিস্তানে ভুক্তভোগী ৭১ শতাংশ শিশু এই নিপীড়নের কথা কাউকে জানায় না। জরিপে অংশ নেওয়া কোনো শিশুই পুলিশ, হেল্পলাইন বা সমাজকর্মীদের মতো আনুষ্ঠানিক কোনো মাধ্যমে অভিযোগ দেয়নি। লাহোরভিত্তিক শিশু অধিকার সংস্থা পহচানের পরিচালক মেহেক নাঈম জানান, নথিভুক্ত নিপীড়নের প্রায় ৪৪ শতাংশই অনলাইনে ঘটছে, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপ ও স্ন্যাপচ্যাট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
অপরাধীরা কৌশলে ভুক্তভোগীর গোপন ছবি, ভিডিও বা সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে। এরপর সেগুলো পরিবার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে সাধারণত ভুক্তভোগীকে আরও নতুন কোনো সংবেদনশীল ছবি দিতে, শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করতে কিংবা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে বসে। রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার কারণে মেয়েরা সবচেয়ে বেশি এ ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। মানবাধিকার আইনজীবী সালমান আফ্রিদি একে একটি বাণিজ্যিক ইকোসিস্টেম হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে শিশুদের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যৌন কনটেন্ট তৈরি ও বাণিজ্য করা হচ্ছে। তিনি জানান, শিশুদের প্রলুব্ধ করা, ব্ল্যাকমেইল ও তা বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পুরো একটি চক্র কাজ করছে।
পাকিস্তানে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭৪ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যা তাদের অনলাইন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ দমনে আইনি কাঠামো থাকলেও অলাভজনক সংগঠন মুসলিম হ্যান্ডসের মুখপাত্র তাহিরা আফ্রাসিয়াব জানান, এটির কোনো বাস্তবায়ন নেই। এদিকে, পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকার ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিলেও তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ডিজিটাল অধিকারকর্মী ওসামা খিলজি এই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং জানিয়েছেন যে শিশুরা ভিপিএন ব্যবহার করে সহজেই এই বাধা এড়িয়ে যাবে, যা তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেবে।

























