পুলিশের দাবি উন্নতি, বাস্তবে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা ও উৎকণ্ঠা
- আপডেট সময় : ০৮:৩২:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দেশের আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে, খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের মতো অপরাধ কমেছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ভঙ্গুর রাষ্ট্র কাঠামোয় দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধার, বিশেষ অভিযান, চাঁদাবাজ ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মতো পরিকল্পনা কার্যকর করায় এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সময়ের তুলনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে খুন হয়েছে ২৬০৭টি। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত খুন হয়েছে ২৩৩২টি। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে খুনের ঘটনা ২৭৫টি কমেছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন ১,৯২২টি এবং ধর্ষণের ঘটনা ১৯৪টি হ্রাস পেয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতার ঘটনাও ৯৯৯টি থেকে কমে ১৬৩টিতে নেমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সরকারি প্রতিবেদনের এই পরিসংখ্যানের বিপরীতে বাস্তবে জনমনে স্বস্তি নেই। সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধের পাশাপাশি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত বছরের জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ১১ হাজার ২৬৯টি আর চলতি বছরের একই সময়ে ঘটে ৯৩৪৭টি। আগের বছরের তুলনায় নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনা ১৯২২টি কমেছে। জাতীয় সংসদেও বিরোধী দল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-রংপুর লংমার্চ কর্মসূচিতে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধের দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের পরিসংখ্যানে অপরাধ কম দেখালেও ঘটনার বর্বরতা ও ভয়াবহতা জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে পল্লবীতে শিশু রামিসা, চট্টগ্রামের ফারিয়া, রংপুরের গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবার, লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়ে, সিলেটের ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার ও তার পরিবার এবং গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পাঁচজন খুনের ঘটনা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। এছাড়া সম্প্রতি আদাবর ও ফরিদপুরের মধুখালীতে খণ্ডিত লাশ উদ্ধার এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার ছেলে ও খুলনার শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা জননিরাপত্তার প্রশ্নকে আরও বড় করে তুলেছে।
ছিনতাইয়ের ঘটনাও বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এছাড়া মোবাইল ফোন ছিনতাই, মানিব্যাগ ছিনতাই, মহিলাদের ভ্যানিটি ব্যাগসহ দামি সরঞ্জাম ছিনতাইয়ের ঘটনা তো রেকর্ড বেড়েছে। প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ থানায় গিয়ে মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জিডি করছে। বেড়েছে চুরি, সিঁধেল চুরি ও ছিঁচকে চুরিও। জানুয়ারি থেকে জুন ছয় মাসে ২৬৪টি ডাকাতির মামলা হয়েছে বিভিন্ন থানায়। একই সময়ে দস্যুতার মামলা হয়েছে ৯০৭টি। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, চাঁদাবাজি ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে চাঁদাবাজির ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে। জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন, সাভারে এসআই আলতাফ হোসেন এবং উত্তরায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে ভীতি তৈরি করেছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, ছিনতাইয়ের ভয়ে তিনি এখন পার্কে হাঁটতে যাওয়া বা সকালে বের হওয়ার সাহস পান না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, সরকার মারাত্মক অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি সচেতন নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। পুলিশের মুখপাত্র এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, পরিসংখ্যানই বাস্তবতা, আর নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি মূলত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি দাবি করেন, অপরাধের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাওয়ায় মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, পুলিশের পরিসংখ্যানে অপরাধ কম মনে হলেও মানুষের নিরাপত্তাহীনতার বোধ অমূলক নয়। তিনি মনে করেন, পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেই মানুষ এমনটা ভাবছে। তিনি আরও বলেন, কেবল পুলিশ দিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; জনসাধারণকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং লোমহর্ষক অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা গেলেই জনমনে স্বস্তি ফিরবে।



























