মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খাঁড়ায় রুশ তেল নিয়ে উভয় সংকটে মোদি
- আপডেট সময় : ১২:১৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খাঁড়ায় পড়ে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একদিকে রাশিয়ার সস্তা তেল কেনা কমালে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক নির্বাচনে রাজনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে এই আমদানি অব্যাহত রাখলে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের শুল্কের মুখে পড়তে পারে ভারতীয় পণ্য। এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ খুঁজে পাচ্ছে না নয়া দিল্লি।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে সস্তায় রুশ তেল কিনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ভারত। বর্তমানে দেশটির মোট তেলের চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি আসে রাশিয়া থেকে। তবে সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত একটি বিলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ওই বিলে রাশিয়া থেকে বড় অঙ্কের তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়া দিল্লি।
নয়া দিল্লির পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষতি করার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত বিভিন্ন উৎস থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, এই অনড় অবস্থানের কারণে তা আরও ঘনীভূত হতে পারে। ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যে পরিকল্পিত বাণিজ্য চুক্তি কয়েক দফা পিছিয়ে গেছে।
তবে ভারতের দুটি সূত্র জানিয়েছে, নয়া দিল্লি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আশা ছেড়ে দেয়নি। যদি মার্কিন শুল্কের কারণে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়, তবে ভারতকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে করা চুক্তির ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। গত বছর যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই করার পর ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করেছে এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ কানাডার সঙ্গে আরেকটি চুক্তি সম্পন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে মোদি যখন যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন, তখন ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক অগ্রগতির আশা করছে নয়া দিল্লি। অবশ্য এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, বিগত এক বছরে বিভিন্ন কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে মার্কিন শুল্ক অন্যতম। তিনি বলেন, মার্কিন কংগ্রেসে ব্যাপক দ্বিদলীয় সমর্থন পাওয়া এই নতুন বিলটি ভারতের রুশ তেল ক্রয়ের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ এবং এটি এখন পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আঘাত হতে পারে। কুগেলম্যানের মতে, এই বিলটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন দুই পক্ষ বাণিজ্য আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে, যা সফল করতে অত্যন্ত সতর্ক কূটনীতির প্রয়োজন হবে।
ভারতে এই বিষয়টি ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধী দলগুলো মোদি সরকারকে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। আগামী বছরের শুরুতে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব এবং মোদির নিজের রাজ্য গুজরাটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাটে মোদির দল বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়া তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অতীতে চীনের বিপরীতে ভারতকে একটি কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে ওয়াশিংটন গুরুত্ব দিলেও গত এক বছরে মার্কিন সিদ্ধান্তের কারণে বারবার হোঁচট খেয়েছে নয়া দিল্লি। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, যার অন্যতম কারণ ছিল ভারতের রুশ তেল কেনা। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প সেই শুল্ক প্রত্যাহার করে নেন এই শর্তে যে ভারত রুশ তেল কেনা কমাবে এবং বাণিজ্য বাধা দূর করবে। তবে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সাময়িকভাবে আমদানি কমালেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর সৃষ্ট বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের মুখে ভারত পুনরায় রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি বাড়ায়।
ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলো ইতিমধ্যেই সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য রুশ তেলসহ প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করে ফেলেছে। নয়া দিল্লি বরাবরই তেল আমদানি কমানোর মার্কিন চাপ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের যুক্তি, দেশের বিশাল জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অত্যন্ত জরুরি। নয়া দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব জানান, ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হলে তা ভারতীয় রপ্তানিকারক ও মার্কিন ভোক্তা—উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বাণিজ্যে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাবে। অন্যদিকে, ভারতীয় বিশ্লেষকদের দাবি, ভারতের এই তেল ক্রয় ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থায়ন করছে না, বরং এটি বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করছে।
এই কড়া প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর থেকে যে জ্বালানি বাণিজ্য ভারতকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করে দিয়েছে, তা এখন দেশটির বৃহত্তর কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।



























