মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে সংঘাত বাড়ানোর বার্তা দিল ইরান
- আপডেট সময় : ০৪:২৫:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪: ০১
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাত আরও তীব্র করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার চেষ্টা চালানোর পর দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ এবং হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় তেহরান এখন আরও আক্রমণাত্মক কৌশল বেছে নিচ্ছে।
গত মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের একটি নৌযানে হামলার চেষ্টার জবাবে তারা ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে জর্ডানে মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করে এমন একটি ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। এর মাত্র তিন দিন আগে ইরান প্রথমবারের মতো একটি মার্কিন সামরিক জাহাজকে লক্ষ্য করে সরাসরি হামলার চেষ্টা চালায়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত রোববার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আইনপ্রণেতাদের জানান, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কেবল ‘সমানুপাতিক প্রতিক্রিয়া’ দেখানোর দিন এখন শেষ। একই সময়ে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন। এর ফলে হরমুজ প্রণালির বাইরেও সংঘাতের পরিধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা তীব্র সামরিক অভিযান ইরান অনেকাংশেই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চলমান এই ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ দেশটির জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক হুমকি তৈরি করেছে, যা তেহরানকে তাদের সামরিক বাগাড়ম্বর ও আক্রমণ আরও তীব্র করতে বাধ্য করছে। মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের আয়ের মূল উৎস তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যেই মঙ্গলবার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সংকটের কারণে পেট্রোলের দাম বাড়িয়েছে ইরান সরকার। তীব্র মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়নে জর্জরিত দেশটিতে এই সিদ্ধান্ত নতুন করে গণঅসন্তোষ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় বর্তমানে সীমিতসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করছে। ফলে ইরান এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করার যে চেষ্টা করছিল, তা সফল হচ্ছে না। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও ওয়াশিংটনের ওপর ইরানের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের ইরান-বিষয়ক বিশ্লেষক ফারজান সাবেত মনে করেন, ইরান সামরিক সংঘাত বাড়ালেও একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে চাইবে। তারা মূলত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি বা হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরানের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা গত এপ্রিলের সমঝোতা স্মারকে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ বন্ধের জন্য নতুন করে আলোচনার কথা বললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে আগ্রহ দেখাননি। তিনি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার কৌশলই অনুসরণ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে সংঘাত বাড়ানো তাদের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ। কারণ একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধ ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম ‘আমওয়াজ.মিডিয়া’র সম্পাদক মোহাম্মদ আলী শাবানি এই পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, কূটনীতি ব্যর্থ হলে ইরানিরা হামলার শিকার হওয়ার জন্য মার্কিন নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি উল্লেখ করেছেন, দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর উদ্যোগ ছিল একটি বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি। আগে সরাসরি মার্কিন নৌযানকে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে ইরান সতর্ক থাকলেও এখন সেই হিসাব বদলে গেছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানি ট্যাংকার ধ্বংসের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটনও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে।





























