আর্থিক খাত সংস্কারে বিশ্বব্যাংকের ১২৬১ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে
- আপডেট সময় : ১২:৪৭:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে ঢেলে সাজাতে এবং এর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। 'ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট (এফএসএসপি-২)' নামের এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক প্রধান অর্থায়নকারী হিসেবে ঋণ দেবে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিসভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় এটিসহ বিভিন্ন খাতের মোট ১৫টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হবে।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার করা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তা করা। এছাড়া, আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন, পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তাদির মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ট্রাস্ট ফান্ড (ডিআইটিএফ)-এর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ও ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতিশীলতার উন্নতি ঘটানোও এর অন্যতম লক্ষ্য।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতার অভাব, সম্পদে অসুলভতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্বল প্রযুক্তিগত সক্ষমতাসহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। এসব সমস্যা নিরসনই এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন মাত্র ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে দেবে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে ২০৩১ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থিক খাত উচ্চ মাত্রার নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল), সুশাসনের অভাব এবং পুরোনো আইসিটি ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। কিছু ব্যাংক, বিশেষ করে সরকারি ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকগুলো তারল্য ও মূলধন সংকটের কারণে ঋণাত্মক মূলধনের সম্মুখীন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এই সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা জিডিপির গতি মন্থর করেছে এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এছাড়াও, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের তদারকি ব্যবস্থায় পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো এবং সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে সাইবার আক্রমণ ও ক্রস-বর্ডার আর্থিক ঝুঁকির মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এই সম্মিলিত চ্যালেঞ্জগুলো আমানতকারীর আস্থা, আর্থিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করে আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
তবে, প্রকল্পের কিছু খাতের ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে। শুধু আইসিটি সরঞ্জাম কেনায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। কম্পিউটার সফটওয়্যারের জন্য ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং ডেটাবেজ তৈরিতে সাত কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীতে আরও এক কোটি পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে মূলধন খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
প্রশিক্ষণেও উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে আইডিএর অর্থায়ন ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অংশ ৩ কোটি টাকা।
এছাড়া, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক নিয়োগে মোট ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সেবার জন্য ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ব্যয়ের সংস্থান রয়েছে।
প্রকল্পের রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সেমিনার ও সম্মেলনে প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং যানবাহন ব্যবহারে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। তবে, নতুন গাড়ি কেনার কোনো সুযোগ নেই; প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক পরিবহন নেওয়া যাবে, সেক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে।
এই উদ্যোগটি বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় নেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্পের ব্যবহারযোগ্য কিছু যন্ত্রপাতি নতুন কর্মসূচিতে স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, তবে অচল বা ব্যবহারের অনুপযোগী সামগ্রী নেওয়া যাবে না।
প্রকল্পের মাধ্যমে আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তদারকি ক্ষমতা এবং আইসিটি কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তাদির (পিবিসি) মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়া হবে। ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পেমেন্ট সময়কাল কমানোসহ ব্যাংক রেজল্যুশন ও ব্যাংক পুনর্গঠনের কার্যকর বাস্তবায়ন করা হবে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাসনব্যবস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার উন্নতি ঘটানো হবে।




























