লোহিত সাগরে সৌদি ট্যাংকারে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা

- আপডেট সময় : ০৯:০৭:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। এই ঘটনার ফলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বিশ্বের তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি নৌপথ বাব এল-মান্দেব প্রণালিও এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি পতাকাবাহী এনসেলিয়া ট্যাংকারটি জিজান বন্দরের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার পর জরুরি বিপদসংকেত পাঠিয়েছিল। ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি পতাকাবাহী এই ট্যাংকারটি আল-শুকাইক বন্দরের প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে লায়লা নামক আরেকটি ট্যাংকারে হামলার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বুধবার পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার বাব এল-মান্দেব প্রণালি এড়াতে তাদের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এর আগের দিন চীন ও ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করা তিনটি ট্যাংকারও একই কারণে ঘুরে ফিরে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের এই পদক্ষেপ ইরানের কৌশলগত চাপ তৈরির প্রচেষ্টার অংশ। বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও অবরোধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়াতে পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে। কিন্তু বাব এল-মান্দেব প্রণালিও যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে জাহাজগুলোকে উত্তরের সুয়েজ খাল ব্যবহার করতে হবে, যা তেল পরিবহনে কয়েক সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় এবং উল্লেখযোগ্য ব্যয় যোগ করবে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা টানা ১২তম রাতেও অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টির ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করতে তারা অভিযান চালিয়ে যাবে। ইরানের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র বুশেহরে দুটি দফায় একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যা ইরানের একমাত্র চালু বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত। এতে গত দুই দিনে ওই এলাকায় হামলার সংখ্যা তিনটি দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ইরাক সীমান্তের শালামচেহ সীমান্ত ক্রসিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন বলে খুজেস্তান প্রদেশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এর আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান কোনো জাহাজে হামলা চালালে প্রতিবার একটি করে ইরানি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। এর জবাবে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে ইরানি বাহিনী আঞ্চলিক তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালাবে। এমনকি ‘এক ফোঁটা তেলও’ রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না বলেও তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ পানি বিশুদ্ধকরণ ও জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত মাসের শেষ দিক থেকে দেশটিতে ৫৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৫৯২ জন আহত হয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না, তবে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত বেসামরিক অবকাঠামো আন্তর্জাতিক আইনের নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং ৪৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। বুধবার ডেলাওয়্যারের ডোভার এয়ার ফোর্স বেসে নিহত চার মার্কিন সেনাসদস্যের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ট্রাম্প একে তার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি বলে মন্তব্য করেন। তবে পরে জর্জিয়ায় এক বক্তব্যে তিনি যুদ্ধের গুরুত্বকে হালকা করে একে ‘ছোটখাটো সংঘর্ষ’ বা স্কারমিশ বলে অভিহিত করেন। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে একই সময়ে অবরোধের হুমকি কার্যকর হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ, পরিবহনব্যবস্থা ও মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

























