প্রবাসে মৃত্যু বাড়ছে: দিনে গড়ে দেশে আসছে ১৪টির বেশি মরদেহ
- আপডেট সময় : ১০:৩৪:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

বিদেশে প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—মোট ২৭৩ দিনে—দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৪টির বেশি মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব পালন করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।
মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে অনেক সময় হয়রানির শিকার হতে হয় পরিবারকে। কম্বোডিয়ার একটি টাইলস কারখানায় কর্মরত পাবনার আল আমিনের মৃত্যুর ঘটনা এর একটি উদাহরণ। ১২ এপ্রিল ২০২৫ সালে কর্মস্থলে শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। অথচ তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় দেড় বছর। আল আমিনের স্বজনরা জানান, কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় আবেদন প্রক্রিয়া থাইল্যান্ডে পাঠাতে হয়, যা মরদেহ খুঁজে পেতে জটিলতা তৈরি করে।
কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরদেহ আনার আগে একাধিক দপ্তরের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা সময়সাপেক্ষ। তবে আগের চেয়ে এই প্রক্রিয়ার গতি কিছুটা বেড়েছে। নিয়মিত কর্মীরা সময়মতো মরদেহ দেশে আনতে পারলেও, অনিয়মিত বা বৈধ কাগজপত্রহীন কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়। ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ জন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ১৪০ জন এবং ২০২১ সাল থেকে এই সংখ্যা পুনরায় বাড়তে শুরু করে।
চলতি বছর সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা গেছেন সৌদি আরবে, যার সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। এরপরই রয়েছে মালয়েশিয়ার অবস্থান। অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসে মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রায়ই রোগ বা স্বাভাবিক মৃত্যুকে দেখানো হয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, আত্মহত্যা বা খুনের অভিযোগ থাকলেও তা যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আসা মরদেহের ৬৬ শতাংশের ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ উল্লেখ করা হয়েছে, আর বাকি ৩৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনা বা অন্য কারণে।
সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড বা ভবন থেকে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় ১৬ শতাংশের বেশি প্রবাসী মারা গেছেন। ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৮ হাজার ১৬৬ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে, যার মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি মারা গেছেন কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৬৪৯ জনের।
কল্যাণ বোর্ড প্রতিটি মৃত কর্মীর দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা এবং ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান করে। এছাড়া জীবন বিমার সুবিধাও পায় পরিবার। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে দাফন বাবদ ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং আর্থিক অনুদান হিসেবে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, আবেদন করার পর সহায়তা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং অনিয়মিত কর্মীরা অনেক সময় এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত তাপ ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা প্রবাসীদের কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করছে, যা অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান প্রতিটি মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মরদেহ দেশে আনতে কোনোভাবেই কালক্ষেপণ করা উচিত নয় এবং অনিয়মিত কর্মীদের দায়ভারও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনতে এবং প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়াতে সরকার নতুন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।




























