ঢাকা ০২:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শিক্ষার্থীদের বুঝেশুনে আন্দোলন করার আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় আলাদা প্রশ্নপত্র: জাতীয় শিক্ষার ওপর প্রভাব কী মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুজব উড়িয়ে দিলেন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পেমেন্ট খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী ভিসা বন্দিবিনিময়ের জন্য ১৭০০ ফিলিস্তিনির লাশ আটকে রেখেছে ইসরাইল ৭১ টিভির চেয়ারম্যানসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে সমন জারি ওমানে বিপৎসীমায় আটকা পড়া ট্যাংকার থেকে ৪০০ কিমি এলাকায় তেল ছড়িয়েছে প্রাণনাশের হুমকিতে কনটেইনারে লুকিয়ে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার জালিয়াতি: সাহাবুদ্দিনসহ ২০ জনের তদন্ত প্রতিবেদন পেছাল ইয়েমেনের আল-মাকহা ও মারিবে হুথিদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় আলাদা প্রশ্নপত্র: জাতীয় শিক্ষার ওপর প্রভাব কী

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪৯:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিটি সিদ্ধান্ত জাতীয় নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল শিক্ষার্থী নির্বাচন করে না, বরং দেশের শিক্ষা-দর্শন, মেধা মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির দিকনির্দেশনাও দেয়। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা–সম্পর্কিত যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি জাতীয় প্রশ্ন। সম্প্রতি ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ইউনিটের ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম অনুযায়ী আলাদা প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ভর্তি পরীক্ষার আবেদন প্রক্রিয়া ১১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে এবং পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৫ ডিসেম্বর।

অনেকের কাছে এটি ছোট প্রশাসনিক সমন্বয় মনে হতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা, জাতীয় শিক্ষাক্রম (এনসিটিবি–NCTB) এবং সমান প্রতিযোগিতার নীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমি নিজেই দুটি আন্তর্জাতিক ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় পরিচালনা করি, তাই এই সিদ্ধান্ত আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনক হতে পারে। তবে দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, যে নীতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তা সমর্থন করা নৈতিকভাবে সঠিক নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বোর্ডের পাঠ্যবই পরীক্ষা করে না; এটি প্রার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ধারণাগত দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা এবং উচ্চশিক্ষার উপযোগিতা যাচাই করে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, একই পাঠ্যক্রম পড়বে, একই শিক্ষক দ্বারা মূল্যায়িত হবে এবং একই ডিগ্রি অর্জন করবে—সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় ভিন্ন প্রশ্নপত্র থাকা উচ্চশিক্ষার একক একাডেমিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্বের কোনো শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ই একই ভর্তি পরীক্ষায় বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে না। যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থীরা এ লেভেল (A Level), আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট (International Baccalaureate–IB), স্কটিশ হাইয়ার (Scottish Highers) কিংবা বিদেশি কারিকুলাম থেকে আবেদন করলেও তাদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয় না। যুক্তরাষ্ট্রেও স্যাট (SAT) বা এসিটি (ACT) পরীক্ষায় কোনো স্টেটভিত্তিক প্রশ্নপত্র নেই। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডাতেও বোর্ড অনুযায়ী প্রশ্ন বদলানোর নজির নেই, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের ধারা নয়, শিক্ষার্থীর সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করে।

এই সিদ্ধান্ত একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে। আজ ইংরেজি মাধ্যমের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র হলে আগামীকাল মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কিংবা আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট শিক্ষার্থীরাও একই দাবি তুলতে পারে। এটি জাতীয় শিক্ষাক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করবে, কারণ এর মাধ্যমে বার্তা যাবে যে জাতীয় শিক্ষাক্রম যথেষ্ট নয়। এছাড়া, বিদেশি কারিকুলামের বাজার সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশ্লেষণ করা জরুরি। সংবিধানের সমান সুযোগের দর্শনের সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক।

সমাধান হিসেবে পৃথক প্রশ্নপত্র প্রবর্তন না করে ভর্তি পরীক্ষার সিলেবাস স্পষ্ট করা, প্রশ্নের ভাষা নির্ভুল করা, পর্যাপ্ত নমুনা প্রশ্ন প্রকাশ এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান প্রস্তুতির সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, যাতে অভিভাবকরা বিদেশি কারিকুলামের দিকে না ঝুঁকে নিজের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেই আন্তর্জাতিক মানের মনে করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত শিক্ষার্থীদের উৎস নয়, যোগ্যতা মূল্যায়ন করা। সাময়িক লাভের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়াই কাম্য।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় আলাদা প্রশ্নপত্র: জাতীয় শিক্ষার ওপর প্রভাব কী

আপডেট সময় : ০২:৪৯:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
print news

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিটি সিদ্ধান্ত জাতীয় নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল শিক্ষার্থী নির্বাচন করে না, বরং দেশের শিক্ষা-দর্শন, মেধা মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির দিকনির্দেশনাও দেয়। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা–সম্পর্কিত যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি জাতীয় প্রশ্ন। সম্প্রতি ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ইউনিটের ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম অনুযায়ী আলাদা প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ভর্তি পরীক্ষার আবেদন প্রক্রিয়া ১১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে এবং পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৫ ডিসেম্বর।

অনেকের কাছে এটি ছোট প্রশাসনিক সমন্বয় মনে হতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা, জাতীয় শিক্ষাক্রম (এনসিটিবি–NCTB) এবং সমান প্রতিযোগিতার নীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমি নিজেই দুটি আন্তর্জাতিক ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় পরিচালনা করি, তাই এই সিদ্ধান্ত আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনক হতে পারে। তবে দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, যে নীতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তা সমর্থন করা নৈতিকভাবে সঠিক নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বোর্ডের পাঠ্যবই পরীক্ষা করে না; এটি প্রার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ধারণাগত দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা এবং উচ্চশিক্ষার উপযোগিতা যাচাই করে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, একই পাঠ্যক্রম পড়বে, একই শিক্ষক দ্বারা মূল্যায়িত হবে এবং একই ডিগ্রি অর্জন করবে—সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় ভিন্ন প্রশ্নপত্র থাকা উচ্চশিক্ষার একক একাডেমিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্বের কোনো শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ই একই ভর্তি পরীক্ষায় বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে না। যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থীরা এ লেভেল (A Level), আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট (International Baccalaureate–IB), স্কটিশ হাইয়ার (Scottish Highers) কিংবা বিদেশি কারিকুলাম থেকে আবেদন করলেও তাদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয় না। যুক্তরাষ্ট্রেও স্যাট (SAT) বা এসিটি (ACT) পরীক্ষায় কোনো স্টেটভিত্তিক প্রশ্নপত্র নেই। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডাতেও বোর্ড অনুযায়ী প্রশ্ন বদলানোর নজির নেই, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের ধারা নয়, শিক্ষার্থীর সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করে।

এই সিদ্ধান্ত একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে। আজ ইংরেজি মাধ্যমের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র হলে আগামীকাল মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কিংবা আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট শিক্ষার্থীরাও একই দাবি তুলতে পারে। এটি জাতীয় শিক্ষাক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করবে, কারণ এর মাধ্যমে বার্তা যাবে যে জাতীয় শিক্ষাক্রম যথেষ্ট নয়। এছাড়া, বিদেশি কারিকুলামের বাজার সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশ্লেষণ করা জরুরি। সংবিধানের সমান সুযোগের দর্শনের সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক।

সমাধান হিসেবে পৃথক প্রশ্নপত্র প্রবর্তন না করে ভর্তি পরীক্ষার সিলেবাস স্পষ্ট করা, প্রশ্নের ভাষা নির্ভুল করা, পর্যাপ্ত নমুনা প্রশ্ন প্রকাশ এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান প্রস্তুতির সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, যাতে অভিভাবকরা বিদেশি কারিকুলামের দিকে না ঝুঁকে নিজের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেই আন্তর্জাতিক মানের মনে করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত শিক্ষার্থীদের উৎস নয়, যোগ্যতা মূল্যায়ন করা। সাময়িক লাভের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়াই কাম্য।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo