নতুন পে স্কেলের বড় ব্যয়: রাজস্ব ঘাটতির মুখে চ্যালেঞ্জে সরকার
- আপডেট সময় : ১১:০৬:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট, রাজস্ব আহরণে স্থবিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জের মাঝেই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন এই পে স্কেলে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই বিশাল আর্থিক জোগান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সামলানো এবং বেসরকারি খাতের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে একযোগে সব ভাতা কার্যকর হলে প্রতি বছর বেতন-ভাতায় সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। এই অঙ্ক গত অর্থবছরে আহরিত মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে, কেবল চলতি অর্থবছরেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মচারীদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হবে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি কেবল অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের নয়, এটি আগামী বছরগুলোতে সরকারের রাজস্ব ও ব্যয়ের কাঠামোর ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। কারণ, বেতন-ভাতা একবার বাড়লে তা পরবর্তী বছরগুলোতেও বহাল রাখতে হয়। ফলে সরকারের রাজস্ব আহরণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি বিনিয়োগের সক্ষমতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ পড়বে।
তবে নতুন বেতন কাঠামোতে বেতন পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও অন্তত এক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ। বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব সংবাদমাধ্যমকে জানান, নতুন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর নতুন কাঠামো অনুসারে বেতন নির্ধারণ করে তা ‘আইবাস প্লাস প্লাসে’ যুক্ত করা হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যাবে।
দেশে এমন এক সময়ে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হলো, যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট চলছে। এই সংকটের কারণে দেশের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। সহসাই এই সংকট কাটার কোনো লক্ষণ দেখছে না সরকারও। জ্বালানি সংকট দূর হতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগবে বলে একাধিকবার জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং রাজস্ব আহরণের গতিও মন্থর হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন পে স্কেল সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যেখানে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা sechs লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, রাজস্ব দিয়ে বাজেটের পুরো ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না এবং বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা থাকলেও আদায় হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা কম। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা sechs লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা হলেও অর্থবছর শেষে বিশাল ঘাটতি থাকার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন অবস্থায় নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারকে ব্যয় সংকোচন ও রাজস্ব আহরণে জোর দিতে হবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সংশ্লিষ্ট খাতে মোট এক লাখ ৪১ হাজার ৪チュア কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে। দেশে গত চার বছর ধরে চলা মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে, যেখানে বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। বাজারে এমনিতেই নিত্যপণ্যের দাম চড়া, তার ওপর নতুন পে স্কেলের প্রভাবে বাজারে উত্তাপ আরও বাড়তে পারে।
দেশের শ্রমবাজারের সিংহভাগ জুড়ে থাকা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্য এই পে স্কেল জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। নির্দিষ্ট ও সীমিত আয়ের এসব চাকরিজীবীর আশঙ্কা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার প্রভাবে বাজারদর থেকে শুরু করে বাড়ি ভাড়া পর্যন্ত সব খরচ লাফিয়ে বাড়বে, অথচ তাদের নিজস্ব আয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, পে স্কেলের প্রভাবে বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়, যা চাহিদা বাড়িয়ে সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ‘মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতি’ থেকে। নতুন পে স্কেলের ঘোষণা আসার পর অসাধু ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যমূল্য ও বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে দেয়।
এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সীমিত আয়ের বেসরকারি কর্মীদের ওপর। বাজারে দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ বাড়লেও অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত বেতন বাড়ানোর কোনো নীতি নেই। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করতে হয় ও সঞ্চয় ভাঙতে হয়। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের নিশ্চিত আর্থিক নিরাপত্তা, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান ও আয়ের অনিশ্চয়তা—দুইয়ের ব্যবধান এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। এ বিষয়ে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বীকার করেন যে, নতুন জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও এই পে স্কেল বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তাদের আয় না বাড়লেও খরচ বাড়বে, যা সামাজিক বৈষম্য ও তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন পে স্কেলের বাড়তি অর্থায়ন যুক্ত হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। কারণ, একই সময়ে শিল্পের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি। সরকার যদি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নেয়, তবে ব্যাংকের সীমিত আমানত ও তারল্যের একটি বড় অংশ সেদিকে চলে যেতে পারে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়লেও রাজস্ব ঘাটতি, সরকারি ঋণ, সুদ ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ—সবগুলো সূচকে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে রাজস্ব বনাম ব্যয়। সরকার যদি বাড়তি পে স্কেল ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করের আওতা ও আদায় বাড়াতে পারে, তাহলে চাপ অনেকটাই সামলানো সম্ভব। কিন্তু রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার ছাড়া ঋণনির্ভর অর্থায়ন বাড়লে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ জানান, দীর্ঘ ১১ বছর পর মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা কর্মচারীদের জন্য এই পে স্কেল অত্যন্ত দরকারি ছিল। তবে তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সব মিলিয়ে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা বাড়লেও রাজস্ব ঘাটতি, সরকারি ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোই এখন সরকারের মূল পরীক্ষা।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সংশ্লিষ্ট খাতে মোট এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে এই ব্যয় আরো বাড়বে।



























