সিলেট বিভাগজুড়ে নিখোঁজের হিড়িক, তিন মাসে উধাও অন্তত ৪৭ জন
- আপডেট সময় : ০৪:২৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

সিলেট বিভাগজুড়ে এখন এক অদৃশ্য আতঙ্কের ছায়া। চলতি বছরের শুরু থেকেই একের পর এক নিখোঁজের ঘটনায় অভিভাবকমহলে বাড়ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। কেবল জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে অন্তত ৪৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব পাওয়া গেলেও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রকৃত ঘটনা ও লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা হিসাব মেলালে নিখোঁজের সংখ্যা অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন ছাড়িয়ে যাবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই মাসে অন্তত ১১ জন, আগস্টে ১৫ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২১ জন নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ হওয়া ৪৭ জনের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরের সংখ্যা অন্তত ২৭ জন। এর মধ্যে অন্তত ১৩ জন মাদরাসা শিক্ষার্থী। নিখোঁজের পর কারো কারো লাশ উদ্ধারের মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে, যেমন টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে শিশু রুকাইয়া কিংবা কমলগঞ্জের নদীতে মাসুক মিয়ার মরদেহ। আবার সিলেটের জাবালে নূর হাফিজিয়া মাদরাসার দুই শিক্ষার্থীর নিখোঁজের পর মুক্তিপণ দাবির নাটকীয়তা তৈরি হলেও পরে জানা যায় তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে গৃহত্যাগ করেছিল।
অনেক পরিবার লোকলজ্জা, পারিবারিক জটিলতা কিংবা পুলিশি ঝামেলা এড়াতে থানায় অভিযোগ জানান না। আবার অনেক সময় স্বজনরা উদ্ধার হলেও সামাজিক সুনামের ভয়ে তা প্রকাশ করা হয় না। জকিগঞ্জের মাহবুব সরোয়ার রাজন কিংবা ওসমানী বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. আরিফুল্লাহ জেলিনের মতো প্রাপ্তবয়স্কদের রহস্যজনক উধাও হওয়ার ঘটনা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫,৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ জনকে পরিবারে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও ২,০৩৮টি শিশু-কিশোর এখনও অধরা। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অনলাইন জিডি ব্যবস্থার কারণে অভিযোগ দায়ের সহজ হওয়ায় জিডির সংখ্যা বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়েছে। ২০২৩ সালে নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডি ছিল ১৭,৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬,৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২,৫৫০টি।
নিখোঁজদের তালিকায় জেলাভিত্তিক চিত্র উদ্বেগজনক। সিলেট জেলায় নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ফাবিহাতুন নেছা ফাইজা (১৬), আজান আহমদ (৩), জরিনা বেগম (৬০+), কলেজছাত্রী সুমিনা বেগম (১৯), এসএসসি পরীক্ষার্থী বিপাশা দে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা আরিফুল্লাহ জেলিন, ট্যাক্সিচালক মিজানুর রহমান (৩২), কর্মজীবী শাকিল আহমদ রাসেল (২৫), তামিম আহমেদ (১৫), সাঈদ মাসুদ চৌধুরী নাঈম (১৫), মাদরাসা ছাত্র হাসান মাহমুদ (১৩), আরিফ মিয়া (১৩), ইসতিয়াক হোসেন সম্রাট (১৫), স্কুলছাত্র আবির আহম্মেদ (১৪), সালমা আক্তার (২৪) ও তার মেয়ে মরিয়ম (৫)। এর মধ্যে ৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের তালিকায় রয়েছেন তাহিরপুরের রুকাইয়া নূর (১০), জগন্নাথপুরের মাহি আহমদ (৬) ও দরাজ মিয়া; যার মধ্যে দুই শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে। হবিগঞ্জে নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন আশরাফুল, লাবিবা চৌধুরী (১৫), সৈয়দ সাদাফ, তুহিন মিয়া (২৩), আব্দুল মন্নান মনু মিয়া (৭০), ফাবিয়া তাবাস্সুম মীম, রাকিবুল হাসান (১৫) ও আমিনুল ইসলাম তাজিম। মৌলভীবাজারে নিখোঁজদের মধ্যে প্রীতম এরিক পিতু (৩০), শিমলা আক্তার (১৬), আশরাফ মিয়া (৭০), কৃষক মাসুক মিয়া (৪৫) ও সুমিনা বেগম (১৯) উল্লেখযোগ্য, যাদের মধ্যে তিনজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।
সমাজকর্মী আবদুল করিম কিম নিখোঁজের পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপহরণ পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্যের অভাব এবং মাদরাসা শিক্ষার্থীদের তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন। সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি আহমেদ নূর ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ইসমাইল হোসেইন সামাজিক সচেতনতা ও যথাযথ শাস্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এদিকে, সিলেট জেলার নিখোঁজের পরিসংখ্যান নিয়ে পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক মন্তব্য করেছিলেন যে পুলিশের কাছে থাকা তথ্য ভিন্ন, তবে পরবর্তী ১৯ ঘণ্টায় তিনি কোনো তথ্য সরবরাহ করেননি।

























