গাবতলীতে জন্মদিনের রাতে রিকশাচালককে হত্যা, কিশোরের শখের চাকু কেড়ে নিল প্রাণ
- আপডেট সময় : ০১:৫৪:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

ফুটপাত থেকে শখের বশে মাত্র ৬৫০ টাকা দিয়ে একটি চাকু কিনেছিল ১৬ বছরের এক কিশোর। শখের সেই জিনিসটি পেয়ে সে এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিল যে বন্ধুদের ডেকে ডেকে তা দেখিয়েছিল। কিন্তু কে জানত, কয়েক দিন পর নিজের জন্মদিনের রাতেই সেই চাকু দিয়ে এক রিকশাচালকের প্রাণ কেড়ে নেবে সে। গত বুধবার ভোররাতে রাজধানীর দারুসসালামের গাবতলী এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত তিন কিশোরকে গত শনিবার গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগ।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার সূত্রপাত ছিল সাদ (ছদ্মনাম) নামের ওই কিশোরের ১৬তম জন্মদিনকে কেন্দ্র করে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাদের জন্মদিন উপলক্ষে পরিচিত এক বড় ভাই তাকে একটি পার্টিতে ডাকেন, যেখানে সে জীবনে প্রথমবার মদ পান করে। পার্টি শেষে রাত একটার দিকে সে গাবতলী এলাকায় এসে তার বন্ধু ফরিদকে (ছদ্মনাম) ফোন করে ডেকে নেয়। দুজনে মিলে রাতে ঘোরাঘুরি করার সময় একটি পায়ে চালিত রিকশা তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চালকের আচরণ দেখে তাদের সন্দেহ হয়। এ নিয়ে চালকের সঙ্গে তাদের সামান্য কথা-কাটাকাটি হয় এবং চালক সেখান থেকে চলে যান।
রাত তিনটার দিকে তারা তাদের আরেক বন্ধু জাহিদকে (ছদ্মনাম) ফোন করে ডেকে আনে। গাবতলীর আল্লাহর দান হোটেলের পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় আগের রিকশাচালকের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার বিষয়টি ওঠে। জাহিদ তাদের উসকানি দেয় যে, ওই রিকশাচালককে আবার পেলে যেন মারধর করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরই তারা ওই রিকশাচালককে পুনরায় দেখতে পায় এবং আবারও তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে রিকশাচালক পাশের আল্লাহর দান হোটেলের ভেতরে ঢুকলে কিশোরদের ধারণা হয় যে সে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে গেছে। এতে তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
রিকশাচালক হোটেল থেকে বের হওয়া মাত্রই জাহিদ তাঁকে একটি থাপ্পড় মারে। এর পরপরই সাদ তার কাছে থাকা সেই ৬৫০ টাকার চাকুটি বের করে রিকশাচালকের ঘাড়ের পেছনে আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় রিকশাচালক রিকশায় উঠে পালানোর চেষ্টা করলেও কিছু দূর যাওয়ার পর রিকশার ওপরই ঢলে পড়েন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর তিন কিশোরই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে নেমে ডিবি পুলিশ আল্লাহর দান হোটেল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের ছবি শনাক্ত করে। প্রথমে পেশাদার ছিনতাইকারীদের জড়িত থাকার সন্দেহ করা হলেও পরে জানা যায় ফরিদ গাবতলীর একটি হোটেলে কাজ করত। ডিবি প্রথমে ফরিদকে যাত্রাবাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাহিদকে ভোলা এবং মূল অভিযুক্ত সাদকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের মধ্যে সাদের বয়স ১৬ বছর এবং বাকি দুজনের বয়স ১৫ বছরের কম।
হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর নিহত রিকশাচালকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁর নাম ইমন সর্দার (২৬)। তিনি পাবনা সদর উপজেলার রাধানগর গ্রামের রাশেদুল ইসলাম ওরফে মুন্না সর্দারের ছেলে। ইমন ঢাকায় এসে কখনো রিকশা চালাতেন, আবার কখনো দিনমজুরের কাজ করতেন। পারিবারিক অশান্তির কারণে তিনি পরিবারের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ রাখতেন না। ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করার পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে তাঁর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, গ্রেপ্তার হওয়া তিন কিশোরের কারও বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তারা পেশাদার অপরাধীও নয়। মূলত উঠতি বয়সের উত্তেজনা, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও বন্ধুদের উসকানির কারণেই তারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। গাবতলীর এই ঘটনায় কোনো সংগঠিত কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলেও সাধারণ কিশোরদের জীবনে অস্ত্র, নেশা ও বন্ধুদের উসকানির মতো ঝুঁকিগুলো কীভাবে সহজে প্রবেশ করছে, তা উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল এ বিষয়ে বলেন, কিশোর বয়সে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তৈরি হয় না। তাই সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুদের বিষয়ে পরিবারের নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।
বিভিন্ন জেলায় কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযানও চলছে।পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকাতেই ১২৭টি ‘কিশোর গ্যাং’ বা উপদল শনাক্ত করা হয়েছে।




























