শরীয়তপুরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও আইনি হয়রানির নেপথ্যে
- আপডেট সময় : ১০:০১:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র বস্তুনিষ্ঠতা, নির্ভীকতা এবং নিরপেক্ষতা আজ বাংলাদেশে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে। সম্প্রতি শরীয়তপুরে সাংবাদিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় প্রেসক্লাবের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা সাংবাদিকতার জগতের সেই ক্ষতটিকে আবারও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। শরীয়তপুরে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভির প্রতিনিধি এ বি এম ইসরাফিল, নিউজ ২৪-এর প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিনের শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি মোহাম্মদ বরকত উল্লাহর সাথে ঘটে যাওয়া হামলা, ধারাবাহিক হেনস্তা ও আইনি হয়রানি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বর্তমান বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক নির্মম বাস্তব চিত্র।
শরীয়তপুরের ঘটনার মূলে রয়েছে ক্ষমতার তিনটি স্তরের যোগসাজশ—স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং সাংবাদিক নেতৃত্ব। জেলা প্রশাসন কর্তৃক কোনো পূর্ব নোটিশ বা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই ঐতিহ্যবাহী শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ও তিনটি দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত হয়। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে প্রেসক্লাবের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ১৪ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে এই জায়গাটির উন্নয়ন করেছিলেন। কিন্তু পার্ক সম্প্রসারণের নামে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম দিনের আলো এড়িয়ে রাতের আঁধারে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। বিস্ময়করভাবে, জেলা প্রশাসন দাবি করে যে এই উচ্ছেদ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেনের সম্মতিতে হয়েছে। উল্লেখ্য, আবুল হোসেন একই সাথে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি। একজন সাংবাদিক নেতার এমন দ্বৈত ও সাংঘর্ষিক পরিচয় সাধারণ সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির ৮০ শতাংশ সদস্যের তথাকথিত মৌখিক সম্মতি নিয়ে জেলা প্রশাসনের এই উচ্ছেদকে মেনে নেওয়া হয়, যা সাধারণ সাংবাদিকদের স্বার্থের পরিপন্থী।
ক্লাব চত্বরেই প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সময় টিভির প্রতিনিধি এ বি এম ইসরাফিলের ওপর শারীরিকভাবে হামলা চালানো হয়। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল হোসেনের ছেলে পলাশ ও তার দলবল। এছাড়া প্রেসক্লাব উচ্ছেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিক জাহিদ হাসান, বিধান মজুমদার ও বরকত মোল্লা হামলার শিকার হন। জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের হুমকি দিয়ে বলেছেন, 'তোমরা লেখবা, আমরা তোমাগো পিডামু। আমাগো কাছে অনেক সাংবাদিকের তালিকা আছে, রেডি থাইক্কো।'
সাংবাদিকরা আইনি সহায়তা চাইতে গেলে পুলিশ গড়িমসি করে, কিন্তু উল্টো আরিফুজ্জামান মোল্লা ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমান উল্লাহ আমানের করা চাঁদাবাজি ও মারপিটের অভিযোগ পুলিশ দ্রুত গ্রহণ করে। এটি সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। যখনই সাংবাদিকরা প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তখনই তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
পেশাগত অবক্ষয়ের এই ট্র্যাজেডিতে প্রেসক্লাবগুলো এখন আর সাংবাদিকদের অভিভাবক নয়, বরং স্থানীয় রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রেসক্লাবের শীর্ষ পদ পেতে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক লবিং ও দলীয় পরিচয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আক্রান্ত সাংবাদিকদের পাশে না দাঁড়িয়ে প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন রবিনও নীরব ভূমিকা পালন করছেন। একই সঙ্গে মিডিয়া হাউসগুলোও মফস্বলের প্রতিনিধিদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের নিঃসঙ্গ ও অসহায় করে তুলছে। সারা দেশেই সাংবাদিক নির্যাতনের এই ধরন প্রায় একই রকম, যেখানে তথ্য অধিকারের টুঁটি চেপে ধরা হয় এবং পুলিশ প্রশাসন স্থানীয় রাজনৈতিক চক্রের ইশারায় কাজ করে।
সাংবাদিকতাকে এই অন্ধকূপ থেকে টেনে তুলতে মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। সাংবাদিক সংগঠনের গঠনতন্ত্রে সক্রিয় রাজনীতি বা দলীয় পদধারীদের নেতৃত্বের অযোগ্য ঘোষণার ধারা যুক্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন এবং মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য জরুরি আইনি ও চিকিৎসা তহবিল তৈরির কোনো বিকল্প নেই।



























