নেপালের ভয়াবহ বন্যার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া কেন কঠিন ছিল?
- আপডেট সময় : ১০:৫৫:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

নেপাল ও তিব্বতের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে সম্প্রতি যে ভয়াবহ বন্যার ঘটনা ঘটেছে, তার পেছনে ভূমিধস ও হিমবাহ ধসের সম্মিলিত প্রভাব থাকতে পারে বলে ভূতত্ত্ববিদরা ধারণা করছেন। এই দুর্যোগে পানি ও কাদার প্রবল স্রোত এত দ্রুত নিচে নেমে আসে যে, ভবন ও অবকাঠামো গ্রাস করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন ছিল।
সাধারণত হিমবাহ-সংক্রান্ত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকা বা হিমবাহ-হ্রদের পানির উচ্চতা নজরদারিতে রাখা হয়। হিমবাহ পিছিয়ে গেলে সেখানে গলিত পানি জমে হ্রদের সৃষ্টি হয়, যার পানি অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা থাকে। ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কার পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এরান হুড জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণে রিয়েল-টাইম ভিডিও, লেজার প্রযুক্তি এবং নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এসব তথ্যের মাধ্যমে বন্যার সময় এবং নিচু এলাকার ঝুঁকি অনুমান করা হয়।
তবে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার মতো আকস্মিক পর্বতধসের ঘটনার ক্ষেত্রে এমন পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দুর্যোগের পূর্বাভাস দিতে হলে বিস্তীর্ণ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অত্যন্ত ঘন ও ব্যয়বহুল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অধ্যাপক হুডের পরামর্শ অনুযায়ী, সিসমিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড়ি এলাকার ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) চিত্র তৈরি করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ভূ-গঠনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে ধসের ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে, তবে হিমালয়ের দুর্গমতার কারণে ড্রোন বা হেলিকপ্টার নিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো সহজ নয়।
২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালে ২ হাজার ৭০টি হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ২১টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। নেপালের পাশাপাশি চীন ও ভারতের হিমালয় অঞ্চলেও রয়েছে অসংখ্য হিমবাহ-হ্রদ। নেপালের বর্তমান সতর্কীকরণ ব্যবস্থা মূলত নদী ও হ্রদের পানির উচ্চতা পরিমাপের প্রচলিত গেজ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থা বর্ষাকাল বা হিমবাহ-হ্রদের পানি ধীরে ধীরে বাড়ার মতো বন্যার পূর্বাভাস দিতে পারলেও, পাহাড়ের অংশ আকস্মিকভাবে ধসে মুহূর্তের মধ্যে প্রবল স্রোত তৈরি হলে তা শনাক্ত করে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য বর্তমান ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির জ্যেষ্ঠ বিভাগীয় প্রকৌশলী সুশীল কুমার শ্রেষ্ঠা জানান, ওই অঞ্চলে সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু থাকলেও বন্যার পানি এত দ্রুত নেমে আসে যে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয়নি। চীন তাদের হিমবাহ ও পার্বত্য এলাকার পর্যবেক্ষণব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো, বোল্ডারের হিমবাহ ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ আলটন বায়ার্স মনে করেন, শুধু সতর্কীকরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি ও সেগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। তিনি জাপানের সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঝুঁকি শনাক্ত হলে বিভিন্ন ভাষায় সাইনবোর্ড ও সম্প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে কী করতে হবে তা জানানো হয়, যা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর নেপালে তিনটি হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়তা করেছিলেন বায়ার্স। তার মতে, নেপাল সরকার সতর্কীকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে তখন জানিয়েছিলেন, সতর্কসংকেত বাজলে সেটি কেমন শোনায় এবং সংকেত পাওয়ার পর তাদের কী করা উচিত—তা তারা জানতেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সতর্কীকরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ বন্যাপ্রবণ এলাকায় নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ সরিয়ে নেওয়ার পথ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ দুর্যোগে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। বায়ার্স সতর্ক করে বলেন, হিমবাহ ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি এখন আর শুধু ‘কখনো ঘটতে পারে’—এমন কোনো সম্ভাবনার বিষয় নয়; বরং প্রশ্নটি হলো, পরবর্তী বন্যা কখন ঘটবে।




























