ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক: সমতার ভিত্তিতে নতুন পথচলার প্রয়োজনীয়তা
- আপডেট সময় : ০৬:৩১:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতকে একটি প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মাধ্যমে মানচিত্রে বড় পরিবর্তন এলেও, ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক-রাজনৈতিক সক্ষমতার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর তার প্রভাব দীর্ঘকাল বজায় ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল ও বাংলাদেশে এই প্রভাববলয়ের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর নতুন করে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ সামনে এসেছে। শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের অনেক নেতা বর্তমানে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক কৌশলের ফল হিসেবে দেখা সঠিক নয়; এটি ছিল একটি জাতির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ফসল। ভারতের সহযোগিতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তা স্বাধীনতার মূল চালিকা শক্তি নয়। অনেকের মতে, স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত বাংলাদেশকে একটি ঘনিষ্ঠ কিন্তু নির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে রাখতে চেয়েছে, যা গত দেড় দশকে আরও সুসংহত হয়েছিল। শেখ হাসিনার ‘ভারতকে যা দিয়েছি, তা তারা সারা জীবন মনে রাখবে’—এই বক্তব্য জনমনে সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে তুলেছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট বুঝতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরবর্তী সময় থেকে শুরু করতে হয়। ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং সামরিক শাসনের অধীনে বাঙালিদের বঞ্চনা ও অধিকারহীনতা স্বাধীনতার দাবিকে শক্তিশালী করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে কৌশলগতভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর লোকসভার বক্তব্য, যেখানে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর পাকিস্তানকে দুর্বল করার কৌশলের কথা উল্লেখ করেন, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শ্রীনাথ রাঘবনের ‘১৯৭১: এ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ’, অবিনাশ পালিওয়ালের ‘ইন্ডিয়া’স নিয়ার ইস্ট’ এবং এস জয়শংকরের ‘দ্য ইন্ডিয়া ওয়ে’ বইগুলোতে ভারতের এই কৌশলগত স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে গভীর পরিবর্তন আসে। শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন নেক’-এর নিরাপত্তা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনে ভারতের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। অবিনাশ পালিওয়ালের মতে, ভারত তখন ‘আড়াই ফ্রন্ট’ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছিল। পাকিস্তান নাগা নেতা এ জে ফিজো ও মিজো নেতা লালডেঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল। ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মিজো বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যবহৃত হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৭১-এর পর এই কার্যক্রম মিয়ানমারে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯৮৬ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে মিজোরামে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। এই প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথক রাষ্ট্রে রূপান্তর ভারতের জন্য ‘আড়াই ফ্রন্ট’ থেকে ‘দুই ফ্রন্ট’-এ নেমে আসার সুযোগ করে দেয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ না করলেও, পরবর্তী সময়ে এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে কখনোই সমান গুরুত্ব দেয়নি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার বাতিল এবং ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করা হয়, যা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেয় এবং সামরিক হস্তক্ষেপ করে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই প্রক্রিয়ায় ভারতের ভূমিকা কতটা মানবিক এবং কতটা নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থকেন্দ্রিক ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বাংলাদেশ অবশ্যই ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। কোনো অবস্থাতেই এমন সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয় যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদাকে খর্ব করে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে অসম ও একপক্ষীয় বলে সমালোচিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাখ লাখ মানুষের রক্ত ও ত্যাগের ফসল, যা কোনো বাহ্যিক শক্তির দান নয়। তাই ভবিষ্যতেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আধিপত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া জরুরি।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ, যা বাঙালির জাতীয় চেতনার ভিত্তি গড়ে তোলে।
অনেকের মতে, ১৯৪৮ সাল থেকেই ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার সম্ভাব্য সুযোগ খুঁজছিল।সম্প্রতি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী লোকসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, তাঁর দাদি ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে দেশটিকে বিভক্ত করেছিলেন।





























