মিল্কিওয়ের বাইরে প্রথমবার নক্ষত্রধারার সন্ধান, মিলবে ডার্ক ম্যাটারের সূত্র
- আপডেট সময় : ১০:৫৯:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

মহাবিশ্বের রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার পদার্থের রহস্য উন্মোচনে এক বড় অগ্রগতি অর্জন করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে প্রথমবারের মতো একটি নক্ষত্রধারা বা ‘স্টেলার স্ট্রিম’ শনাক্ত করা হয়েছে। প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি গ্যালাক্সিতে এই নক্ষত্রধারার সন্ধান মিলেছে, যা ওই গ্যালাক্সির মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এবং অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের বিন্যাস বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে।
গত বুধবার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের তথ্যমতে, নতুন আবিষ্কৃত এই নক্ষত্রধারাটি মূলত একটি ‘গ্লোবুলার ক্লাস্টার’-এর অবশিষ্টাংশ। গ্লোবুলার ক্লাস্টার হলো অত্যন্ত ঘনভাবে থাকা হাজার হাজার নক্ষত্রের বিশাল গোলাকার সমষ্টি। কোনো গ্যালাক্সির তীব্র মহাকর্ষীয় টানে এই ক্লাস্টারগুলো যখন ভেঙে পড়ে, তখন এর নক্ষত্রগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি দীর্ঘ ও সরু ধারা তৈরি করে, যাকে বিজ্ঞান পরিভাষায় ‘গ্লোবুলার ক্লাস্টার স্টেলার স্ট্রিম’ বলা হয়।
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভেতরে ইতিপূর্বে বেশ কিছু নক্ষত্রধারা আবিষ্কৃত হলেও, বাইরে এমন আবিষ্কার এই প্রথম। বিজ্ঞানীরা জানান, এই নক্ষত্রধারাটি ‘ইউজিসি৯০৫০-ডিডাব্লিউ১’ নামের একটি ‘আল্ট্রা-ডিফিউজ’ গ্যালাক্সিতে অবস্থান করছে। এই ধরনের গ্যালাক্সিগুলো আকারে বেশ বড় হলেও অত্যন্ত ক্ষীণ ও ছড়ানো ছিটানো থাকে। ফলে এর পেছনে থাকা ক্ষীণ নক্ষত্রধারাটি শনাক্ত করা বিজ্ঞানীদের জন্য সহজ হয়েছে। গবেষণার প্রধান নেতৃত্বদানকারী জুলি কিল হোম জানান, হাবল টেলিস্কোপের আর্কাইভে থাকা তথ্য পর্যালোচনার সময় তারা প্রথমে এই ক্ষীণ ধারাটি দেখতে পান এবং পরে নিশ্চিত হন যে এটি একটি ভেঙে যাওয়া গ্লোবুলার ক্লাস্টারের অংশ।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ওই গ্যালাক্সিটির মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের একটি মানচিত্র তৈরি করতে পেরেছেন। গ্যালাক্সির মহাকর্ষ নক্ষত্রধারার আকার ও গতিপথকে প্রভাবিত করে, যা বিশ্লেষণ করে গ্যালাক্সির মোট ভর এবং দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ অনুমান করা সম্ভব। ডার্ক ম্যাটার এমন এক রহস্যময় উপাদান যা সরাসরি দেখা যায় না এবং কোনো আলো শোষণ বা নির্গত করে না। তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণেই এর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার।
গবেষক সারাহ পিয়ারসন বলেন, আল্ট্রা-ডিফিউজ গ্যালাক্সিগুলো এ ধরনের নক্ষত্রধারা খুঁজে পাওয়ার জন্য চমৎকার ক্ষেত্র। এই নক্ষত্রধারাগুলোকে বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক ‘ব্রেডক্রাম্ব ট্রেইল’ বা পথের সংকেত হিসেবে বিবেচনা করছেন, যার মাধ্যমে কোনো গ্যালাক্সির বিবর্তনের ইতিহাস জানা সম্ভব। মিল্কিওয়ের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ডার্ক ম্যাটারের বণ্টন বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, যা এখন অন্য গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যাবে। এছাড়া, নক্ষত্রধারার মধ্যকার ফাঁকা বা ঘন অংশগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ক্ষুদ্র ডার্ক ম্যাটার কাঠামো যখন নক্ষত্রধারার মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেখানে এ ধরনের ফাঁক তৈরি হতে পারে। তবে এর পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে, যা নিশ্চিত হতে আরও নক্ষত্রধারা খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক টিজস্কে স্টারকেনবার্গ জানান, ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে এ ধরনের মহাজাগতিক কাঠামো আবিষ্কারের গতি বাড়বে। বিশেষ করে নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মতো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এক ছবিতে হাবলের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি আকাশ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। গবেষকদের আশা, মিল্কিওয়ের বাইরে এই প্রথম গ্লোবুলার ক্লাস্টার স্টেলার স্ট্রিম আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মহাজাগতিক গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা হলো, যা ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃত রূপ ও বণ্টন বুঝতে বড় ভূমিকা রাখবে।





























