ঢাকা ০৮:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

বন্যার্ত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এক মহান ইবাদত

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১১:৩২:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



সৃষ্টির সেবা ও মানবপ্রেম ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। ইসলামে মানবসেবাকে কেবল একটি ভালো কাজ হিসেবেই দেখা হয়নি, বরং এটিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত এবং ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে বন্যা বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন মুক্তির অন্যতম বড় মাধ্যম।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাদিস অনুযায়ী, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর পরিবারস্বরূপ। ফলে সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে প্রিয়, যে তাঁর পরিবারের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করে। মানবসেবার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত—অভাবী মানুষের ক্ষুধা নিবারণ, বস্ত্রহীনকে কাপড় দেওয়া, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা এবং মজলুমের সহায়তায় এগিয়ে আসা এর অন্তর্ভুক্ত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য কোনো মানুষের সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকে, ততক্ষণ মহান আল্লাহ তার সহযোগিতায় থাকেন।’ (মুসলিম : ২৬৯৯)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কাঁটাযুক্ত ডাল সরিয়ে দেওয়ায় আল্লাহ তার সেই কাজ কবুল করে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন (বোখারি : ৬৫২)।

ইসলামে মানবপ্রেমকে ঈমানের পূর্ণতার শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বোখারি শরিফের ১৩ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ পূর্ণাঙ্গ মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ সে অন্য মুসলমানের জন্য তা ভালো না বাসবে, যা নিজের জন্য ভালোবাসে।’ এমনকি মানবপ্রেম জান্নাতি হওয়ার লক্ষণ। জান্নাতিদের আলোচনায় আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। তারা বলে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের আহার দান করি এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা দাহর : ৮-৯)।

মহান আল্লাহ দয়ালুদের ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। তিরমিজি শরিফের হাদিস অনুযায়ী, দয়াময় আল্লাহ দয়ালুদের দয়া করেন; তাই জমিনবাসীর প্রতি দয়া করলে আসমানের মালিকও বান্দার প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন (তিরমিজি : ১৯২৪)। রাসুল (সা.) আরও ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি এতিম-অনাথের রক্ষণাবেক্ষণ বা লালন-পালন করে, সে আমার সঙ্গে পাশাপাশি জান্নাতে থাকবে।’ এ কথা বলে তিনি তাঁর মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল পাশাপাশি রেখে দেখান (তিরমিজি : ১৯১৮)।

কেয়ামতের কঠিন দিনে যখন অন্যান্য ইবাদতের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, তখন এই সৃষ্টিসেবাই বান্দার নাজাতের অসিলা হতে পারে। কারণ শুধু নিজের আমল দিয়ে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যদি না আল্লাহর রহমত থাকে (মুসনাদে আহমদ : ৭৪৭৯)। আর আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসা পাওয়ার সহজ পথ হলো মানুষের উপকার করা। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয়, যে মানুষের বেশি উপকার করে এবং সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোনো মুসলমানের হৃদয়ে আনন্দ দেওয়া, তার কষ্ট দূর করা, ঋণ পরিশোধ করা বা ক্ষুধা নিবারণ করা (মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৮/১৯১)।

সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা আদম সন্তানকে বলবেন যে, তিনি অসুস্থ হয়েছিলেন, খাদ্য ও পানি চেয়েছিলেন, কিন্তু বান্দা তা দেয়নি। বান্দা যখন বিস্ময় প্রকাশ করে বলবে, ‘হে রব, আপনি তো রাব্বুল আলামিন। আমি কীভাবে আপনাকে দেখতে যাব বা খাদ্য-পানি দেব?’ তখন আল্লাহ বলবেন, তাঁর অমুক ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত বা অসুস্থ বান্দাকে সাহায্য করলে বান্দা স্বয়ং আল্লাহকেই সেখানে খুঁজে পেত (মুসলিম : ২৫৬৯)।

মানবসেবা ছিল স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রথম অহি নাজিলের পর যখন তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন, তখন উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা.) তাঁর এই গুণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অভয় দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ তাঁকে কখনই অপমানিত করবেন না, কারণ তিনি আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায়-দুর্বলদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানদারি করেন এবং দুর্যোগগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান (বোখারি : ৩)।

ইসলামে প্রতিটি কল্যাণমুখী কাজই বিপদাপদ ও অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে এবং গোপন দান আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে (মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৩/১১৫)। এমনকি দুজনের মধ্যে বিবাদ মিটিয়ে দেওয়া, কাউকে বাহনে উঠতে বা জিনিসপত্র তুলে দিতে সাহায্য করা, ভালো কথা বলা, মসজিদের দিকে হেঁটে যাওয়া কিংবা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া—সবই সদকা বা দান হিসেবে গণ্য (বোখারি : ২৯৮৯)। শুধু মানুষই নয়, যেকোনো জীবজন্তুর সেবা করার মধ্যেও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অপার সওয়াব ও প্রতিদানের নিশ্চয়তা রয়েছে (বোখারি : ২৩৬৩)।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh

নিউজটি শেয়ার করুন

বন্যার্ত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এক মহান ইবাদত

আপডেট সময় : ১১:৩২:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

সৃষ্টির সেবা ও মানবপ্রেম ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। ইসলামে মানবসেবাকে কেবল একটি ভালো কাজ হিসেবেই দেখা হয়নি, বরং এটিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত এবং ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে বন্যা বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন মুক্তির অন্যতম বড় মাধ্যম।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাদিস অনুযায়ী, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর পরিবারস্বরূপ। ফলে সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে প্রিয়, যে তাঁর পরিবারের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করে। মানবসেবার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত—অভাবী মানুষের ক্ষুধা নিবারণ, বস্ত্রহীনকে কাপড় দেওয়া, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা এবং মজলুমের সহায়তায় এগিয়ে আসা এর অন্তর্ভুক্ত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য কোনো মানুষের সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকে, ততক্ষণ মহান আল্লাহ তার সহযোগিতায় থাকেন।’ (মুসলিম : ২৬৯৯)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কাঁটাযুক্ত ডাল সরিয়ে দেওয়ায় আল্লাহ তার সেই কাজ কবুল করে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন (বোখারি : ৬৫২)।

ইসলামে মানবপ্রেমকে ঈমানের পূর্ণতার শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বোখারি শরিফের ১৩ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ পূর্ণাঙ্গ মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ সে অন্য মুসলমানের জন্য তা ভালো না বাসবে, যা নিজের জন্য ভালোবাসে।’ এমনকি মানবপ্রেম জান্নাতি হওয়ার লক্ষণ। জান্নাতিদের আলোচনায় আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। তারা বলে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের আহার দান করি এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা দাহর : ৮-৯)।

মহান আল্লাহ দয়ালুদের ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। তিরমিজি শরিফের হাদিস অনুযায়ী, দয়াময় আল্লাহ দয়ালুদের দয়া করেন; তাই জমিনবাসীর প্রতি দয়া করলে আসমানের মালিকও বান্দার প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন (তিরমিজি : ১৯২৪)। রাসুল (সা.) আরও ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি এতিম-অনাথের রক্ষণাবেক্ষণ বা লালন-পালন করে, সে আমার সঙ্গে পাশাপাশি জান্নাতে থাকবে।’ এ কথা বলে তিনি তাঁর মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল পাশাপাশি রেখে দেখান (তিরমিজি : ১৯১৮)।

কেয়ামতের কঠিন দিনে যখন অন্যান্য ইবাদতের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, তখন এই সৃষ্টিসেবাই বান্দার নাজাতের অসিলা হতে পারে। কারণ শুধু নিজের আমল দিয়ে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যদি না আল্লাহর রহমত থাকে (মুসনাদে আহমদ : ৭৪৭৯)। আর আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসা পাওয়ার সহজ পথ হলো মানুষের উপকার করা। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয়, যে মানুষের বেশি উপকার করে এবং সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোনো মুসলমানের হৃদয়ে আনন্দ দেওয়া, তার কষ্ট দূর করা, ঋণ পরিশোধ করা বা ক্ষুধা নিবারণ করা (মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৮/১৯১)।

সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা আদম সন্তানকে বলবেন যে, তিনি অসুস্থ হয়েছিলেন, খাদ্য ও পানি চেয়েছিলেন, কিন্তু বান্দা তা দেয়নি। বান্দা যখন বিস্ময় প্রকাশ করে বলবে, ‘হে রব, আপনি তো রাব্বুল আলামিন। আমি কীভাবে আপনাকে দেখতে যাব বা খাদ্য-পানি দেব?’ তখন আল্লাহ বলবেন, তাঁর অমুক ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত বা অসুস্থ বান্দাকে সাহায্য করলে বান্দা স্বয়ং আল্লাহকেই সেখানে খুঁজে পেত (মুসলিম : ২৫৬৯)।

মানবসেবা ছিল স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রথম অহি নাজিলের পর যখন তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন, তখন উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা.) তাঁর এই গুণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অভয় দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ তাঁকে কখনই অপমানিত করবেন না, কারণ তিনি আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায়-দুর্বলদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানদারি করেন এবং দুর্যোগগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান (বোখারি : ৩)।

ইসলামে প্রতিটি কল্যাণমুখী কাজই বিপদাপদ ও অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে এবং গোপন দান আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে (মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৩/১১৫)। এমনকি দুজনের মধ্যে বিবাদ মিটিয়ে দেওয়া, কাউকে বাহনে উঠতে বা জিনিসপত্র তুলে দিতে সাহায্য করা, ভালো কথা বলা, মসজিদের দিকে হেঁটে যাওয়া কিংবা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া—সবই সদকা বা দান হিসেবে গণ্য (বোখারি : ২৯৮৯)। শুধু মানুষই নয়, যেকোনো জীবজন্তুর সেবা করার মধ্যেও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অপার সওয়াব ও প্রতিদানের নিশ্চয়তা রয়েছে (বোখারি : ২৩৬৩)।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh