ঢাকা ০৭:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মাদারগঞ্জে অনিয়মের দায়ে দুই ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী গ্রেপ্তার নিউ ইয়র্কে নামছে না নেতানিয়াহুর উড়োজাহাজ মূল্যস্ফীতির চাপে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করতে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের পাকিস্তান–চীন নতুন সীমান্ত চুক্তি নিয়ে ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া গুলশানে ককটেল বিস্ফোরণ মামলায় ১৫ আসামির ৩ দিনের রিমান্ড ক্ষমতার পাঁচ মাসে কেন হতাশ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, কী বলছে পরিস্থিতি মাদরাসা প্রধানদের ইআইআইএনভিত্তিক সিম কার্ড সচল রাখার নির্দেশ পাংশায় প্রবাসীর স্ত্রী রুনা হত্যায় প্রধান আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যে সংস্কারগুলো এখন জরুরি

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৭:৩৯:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বর্তমানে তাদের ঋণ কর্মসূচির নকশা ও শর্তগুলো পর্যালোচনা করছে। ২০১৯ সালে কোভিড-১৯ মহামারির আগে সর্বশেষ বড় পর্যালোচনার পর এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বের অনেক দেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা ও ঋণসংকটে পড়েছে, যা তাদের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন প্রেক্ষাপটে আইএমএফের কর্মসূচির নীতিমালা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পর্যালোচনায় অন্তত তিনটি মৌলিক বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, ঋণ দেওয়ার শর্তাবলির দিকে নজর দিতে হবে। যেসব দেশের অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ নেই, তাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোই আইএমএফের অর্থায়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক মন্দার সময় সরকার যেন প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারে এবং পরিস্থিতি ভালো হলে ব্যয় কমিয়ে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে, সেই নমনীয়তা থাকা জরুরি। কিন্তু আইএমএফের অর্থ এমন কোনো ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা উচিত নয়, যা নিজেই টেকসই নয়। আইএমএফের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, তহবিলের অর্থ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ঋণ পরিস্থিতি টেকসই হতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক সময় এর উল্টো চিত্র দেখা যায়; আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় সরকার অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমিয়ে বেসরকারি বা অন্য ঋণদাতাদের পাওনা পরিশোধ করছে, যা জনস্বার্থের বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর। ভ্যাটিকানের জুবিলি প্রতিবেদনেও এই উদ্বেগ উঠে এসেছে যে, বহুপক্ষীয় অর্থায়ন অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের বদলে বেসরকারি খাতে অর্থের বহির্গমন ঘটাতে সহায়তা করছে। তাই আইএমএফের কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণহীন পুঁজিপ্রবাহ ঠেকানোর ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক, যাতে আইএমএফের অর্থ কোনোভাবেই পুঁজি পাচারে ব্যবহৃত না হয়।

দ্বিতীয়ত, কর্মসূচিতে আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা থাকা জরুরি। আইএমএফের কর্মসূচি সাধারণত কিছু অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, কিন্তু অর্থনীতি কোনো স্থির সমীকরণ নয়। যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত বা পণ্যের দামের ওঠানামার মতো আকস্মিক ঘটনায় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পূর্বাভাসের পার্থক্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ কারণে কর্মসূচির নকশায় শিক্ষা, জ্ঞান ও অবকাঠামোর মতো জরুরি বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে হবে। কর্মসূচি ব্যর্থ হলে শুধু ব্যয় সংকোচনের পথে না গিয়ে কেন ব্যর্থতা ঘটেছে তা শনাক্ত করতে হবে এবং বিকল্প পরিকল্পনা নিতে হবে। এছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে; সরকারের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে জনগণের কাছ থেকে শর্ত আড়াল করা স্বচ্ছতার পরিপন্থী এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিকে দুর্বল করে।

তৃতীয়ত, আইএমএফের কর্মসূচির রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আইএমএফের ঋণের দায় শুধু বর্তমান সরকারের নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও বর্তায়। তাই কর্মসূচির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করা বা অন্য ঋণদাতাদের স্বল্পমেয়াদি ঋণখেলাপির ক্ষতি কমানো নয়। কোনো কর্মসূচির প্রতি সমর্থন বলতে শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের সম্মতি নয়, বরং ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন থাকা দরকার। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সরকার ও আইএমএফের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির জন্য সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত আইএমএফের সাফল্য মাপা উচিত একটি দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দিয়ে নয়, বরং তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে অর্থায়ন কতটা ভূমিকা রাখল, তার ওপর ভিত্তি করে। যদি কর্মসূচি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বদলে শুধু পুরোনো ঋণ শোধের ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যে সংস্কারগুলো এখন জরুরি

আপডেট সময় : ০৭:৩৯:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বর্তমানে তাদের ঋণ কর্মসূচির নকশা ও শর্তগুলো পর্যালোচনা করছে। ২০১৯ সালে কোভিড-১৯ মহামারির আগে সর্বশেষ বড় পর্যালোচনার পর এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বের অনেক দেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা ও ঋণসংকটে পড়েছে, যা তাদের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন প্রেক্ষাপটে আইএমএফের কর্মসূচির নীতিমালা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পর্যালোচনায় অন্তত তিনটি মৌলিক বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, ঋণ দেওয়ার শর্তাবলির দিকে নজর দিতে হবে। যেসব দেশের অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ নেই, তাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোই আইএমএফের অর্থায়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক মন্দার সময় সরকার যেন প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারে এবং পরিস্থিতি ভালো হলে ব্যয় কমিয়ে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে, সেই নমনীয়তা থাকা জরুরি। কিন্তু আইএমএফের অর্থ এমন কোনো ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা উচিত নয়, যা নিজেই টেকসই নয়। আইএমএফের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, তহবিলের অর্থ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ঋণ পরিস্থিতি টেকসই হতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক সময় এর উল্টো চিত্র দেখা যায়; আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় সরকার অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমিয়ে বেসরকারি বা অন্য ঋণদাতাদের পাওনা পরিশোধ করছে, যা জনস্বার্থের বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর। ভ্যাটিকানের জুবিলি প্রতিবেদনেও এই উদ্বেগ উঠে এসেছে যে, বহুপক্ষীয় অর্থায়ন অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের বদলে বেসরকারি খাতে অর্থের বহির্গমন ঘটাতে সহায়তা করছে। তাই আইএমএফের কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণহীন পুঁজিপ্রবাহ ঠেকানোর ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক, যাতে আইএমএফের অর্থ কোনোভাবেই পুঁজি পাচারে ব্যবহৃত না হয়।

দ্বিতীয়ত, কর্মসূচিতে আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা থাকা জরুরি। আইএমএফের কর্মসূচি সাধারণত কিছু অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, কিন্তু অর্থনীতি কোনো স্থির সমীকরণ নয়। যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত বা পণ্যের দামের ওঠানামার মতো আকস্মিক ঘটনায় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পূর্বাভাসের পার্থক্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ কারণে কর্মসূচির নকশায় শিক্ষা, জ্ঞান ও অবকাঠামোর মতো জরুরি বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে হবে। কর্মসূচি ব্যর্থ হলে শুধু ব্যয় সংকোচনের পথে না গিয়ে কেন ব্যর্থতা ঘটেছে তা শনাক্ত করতে হবে এবং বিকল্প পরিকল্পনা নিতে হবে। এছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে; সরকারের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে জনগণের কাছ থেকে শর্ত আড়াল করা স্বচ্ছতার পরিপন্থী এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিকে দুর্বল করে।

তৃতীয়ত, আইএমএফের কর্মসূচির রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আইএমএফের ঋণের দায় শুধু বর্তমান সরকারের নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও বর্তায়। তাই কর্মসূচির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করা বা অন্য ঋণদাতাদের স্বল্পমেয়াদি ঋণখেলাপির ক্ষতি কমানো নয়। কোনো কর্মসূচির প্রতি সমর্থন বলতে শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের সম্মতি নয়, বরং ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন থাকা দরকার। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সরকার ও আইএমএফের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির জন্য সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত আইএমএফের সাফল্য মাপা উচিত একটি দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দিয়ে নয়, বরং তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে অর্থায়ন কতটা ভূমিকা রাখল, তার ওপর ভিত্তি করে। যদি কর্মসূচি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বদলে শুধু পুরোনো ঋণ শোধের ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo