ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কি নতুন যুদ্ধ বাধাবেন নেতানিয়াহু?
- আপডেট সময় : ০৮:৩৮:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

ইসরায়েলের পরবর্তী নির্বাচনের আর দুই মাসও বাকি নেই, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বর্তমানে বেশ অনিশ্চিত। জনমত জরিপ অনুযায়ী, তার দল লিকুদ পার্টির জনপ্রিয়তা হয় থমকে আছে, নতুবা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এর বিপরীতে মূল বিরোধী দলগুলোর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। অতীতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমাতে নেতানিয়াহু যে ভয়ের কৌশল ব্যবহার করতেন, তা এবার আর ভোটারদের ওপর তেমন প্রভাব ফেলছে না। পাশাপাশি নতুন কয়েকটি ডানপন্থী দলের উত্থান তার ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ধস নামানোর হুমকি তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্টরা সতর্ক করেছেন যে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে নেতানিয়াহু যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া, বিরোধীদের দমনে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করা, নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করা কিংবা পরাজয় নিশ্চিত হলে ট্রাম্পের কায়দায় ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করে দেওয়া। যদিও এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, তবে ৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা জমা দেওয়ার পর নির্বাচনী প্রচারণা পুরোদমে শুরু হতে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু সম্ভবত কৃত্রিমভাবে এক বা একাধিক নিরাপত্তাসংকট তৈরির কৌশল সাজাচ্ছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো তার ধূলিসাৎ হওয়া ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তি উদ্ধার করা। এর মাধ্যমে তিনি লিকুদ পার্টি ছেড়ে যাওয়া মাঝারি ধারার ভোটারদের মনে এই দ্বিধা তৈরি করতে চান যে, তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের মতো অনভিজ্ঞ হাতে দেশের নিরাপত্তা তুলে দেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য তাকে হয়তো বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে হবে না, বরং ছোটখাটো সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন, যেখানে তিনি দাবি করতে পারবেন যে যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
গত ১৮ আগস্ট সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের হামলাকে এই কৌশলের একটি ঝলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতানিয়াহু ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে তুরস্ককে সতর্ক করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে অনেক পর্যবেক্ষকই এই দাবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
নেতানিয়াহুর এ ধরনের অস্থিরতা তৈরির সুযোগ ট্রাম্পের কারণে কিছুটা সীমিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধ দেখতে চান না এবং ইরানকে স্পর্শ না করার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। এছাড়া গাজা ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি আরোপের কারণেও নেতানিয়াহুর হাত বাঁধা। সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে সংঘাত বাড়ানোতেও ঝুঁকি রয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে স্থিতিশীল করতে তুরস্কের সহায়তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তুরস্ককে একটি বড় হুমকি হিসেবে চিত্রিত করছেন। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক ক্ষেত্রটি হলো পশ্চিম তীর। ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। তারা ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি বিদেশি সাংবাদিক ও ইসরায়েলি সেনাদের ওপরও চড়াও হচ্ছে। অতি ডানপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো এই অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের মাধ্যমে পরিস্থিতি চিরতরে বদলে দিতে চাইছে। তাদের লক্ষ্য হলো, ফিলিস্তিনিরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুললে সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহারে বিতাড়নের অজুহাত পাবে।
কিছু সমালোচক আশঙ্কা করছেন, পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে বা নতুন কোনো সংকটের কারণে যুদ্ধ শুরু হলে সেই জরুরি অবস্থাকে অজুহাত বানিয়ে নেতানিয়াহু নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। যদিও ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী নেসেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট ছাড়া এটি অসম্ভব, তবুও তার সমালোচকরা এই সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
দীর্ঘ যুদ্ধের পর ইসরায়েলি ভোটাররা কেন আবার এমন একজনকে ভোট দেবেন যিনি নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন—তা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে ইসরায়েলিদের বড় একটি অংশ মনে করে, যুদ্ধগুলো এখনো অসম্পূর্ণ। তবুও যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢাললেই যে নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন, তা নিশ্চিত নয়। জরিপ বলছে, অধিকাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, নেতানিয়াহু তাঁর নির্বাচনী স্বার্থেই সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এমনকি জোটের ভোটারদের কাছেও সেনাবাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার তুলনায় নেতানিয়াহুর গ্রহণযোগ্যতা কম। তা সত্ত্বেও, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি যে যেকোনো কুটিল কৌশলের আশ্রয় নিতে পারেন, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।





























