বিয়ের পর ওজন বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক কারণ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়
- আপডেট সময় : ১১:৪২:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

বিয়ের পর অনেকেরই ওজন বাড়তে দেখা যায়। সমাজে প্রচলিত রয়েছে ‘বিয়ের পর মানুষ মোটা হয়ে যায়’। বিষয়টি কেবল রসিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন গবেষণাতেও দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের সঙ্গে ওজন এবং বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এর মানে এই নয় যে, বিয়ে সরাসরি মানুষকে মোটা করে। মূলত বিয়ের পর জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তার পরিবর্তনই ওজন বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
২০১২ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ২০টি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিয়ে বা সহবাসের পর মানুষের ওজন বাড়ার প্রবণতা থাকে। অন্যদিকে, বিবাহবিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ওজন কমার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এই বিষয়টি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। সাম্প্রতিক আরেকটি নিয়মতান্ত্রিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অবিবাহিতদের তুলনায় বিবাহিত বা একসঙ্গে বসবাস শুরু করা তরুণ-তরুণীদের বিএমআই বেশি বৃদ্ধি পায়। কিছু গবেষণায় বিয়ের পর শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মিললেও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার ফলাফল এখনও সীমিত। অর্থাৎ, বিয়ের পর মোটা হওয়া কেবল কোনো সামাজিক ধারণা নয়, আবার এর পেছনে সরাসরি কোনো জৈবিক কারণও নেই।
ওজন বাড়ার পেছনে প্রথমত জীবনযাপনের পরিবর্তন কাজ করে। বিয়ের আগে মানুষ নিজের শরীর ও ওজন নিয়ে বেশি সচেতন থাকে। কিন্তু বিয়ের পর সংসার, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে নিজের পেছনে সময় ও মনোযোগ কমে যায়। দ্বিতীয়ত, দম্পতির একজন অন্যজনের খাদ্যাভ্যাস দ্বারা প্রভাবিত হন। সঙ্গী যদি বেশি ক্যালরিযুক্ত বা মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খাবার পছন্দ করেন, তবে অন্যজনেরও সেই অভ্যাস গড়ে ওঠে। একসঙ্গে বাইরে খাওয়া বা অবসরে খাওয়ার সুযোগও বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, বিয়ের পর শারীরিক সক্রিয়তা কমে যায়, যা বিশেষ করে নারীদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে।
অনেকের ধারণা, বিয়ের পর শুধু নারীরাই মোটা হন, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। গবেষণায় পুরুষদের ক্ষেত্রেও ওজন ও বিএমআই বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান ধারণের বিষয়টি এই প্রক্রিয়াকে কিছুটা জটিল করে তোলে। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি এবং সন্তান জন্মের পর ঘুমের ঘাটতি, শিশুর যত্ন ও সময়ের অভাবে আগের ওজনে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে গর্ভাবস্থার ওজন বৃদ্ধি এবং বিয়ের পর অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
কয়েক কেজি ওজন বাড়লেই কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন না। তবে ওজন ক্রমাগত বাড়তে থাকলে এবং কোমর ও পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তা টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, স্থূলতা একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, পরিবেশ ও জিনগত বিষয়ের সঙ্গে জড়িত।
ওজন নিয়ন্ত্রণে কঠোর ডায়েটের চেয়ে দম্পতির যৌথ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বেশি কার্যকর। একসঙ্গে হাঁটা, পুষ্টিকর খাবার তৈরি, চিনি ও ভাজাপোড়া সীমিত করা এবং খাবারে শাকসবজি, ফল ও প্রোটিন রাখা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অথবা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট উচ্চ মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সঙ্গীর ওজন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য না করে তাকে সুস্থ থাকতে সহায়তা করা উচিত।
নিবন্ধটির লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এমপিএইচ (চলতি) শিক্ষার্থী রাইসা মেহজাবীন। তিনি ইনস্পিরন ফিটনেস অ্যান্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টারের ধানমন্ডি শাখার ম্যানেজার এবং নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ-এর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।
আরও সাম্প্রতিক একটি systematic review-তেও দেখা গেছে, অবিবাহিত অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় বিয়ে বা একসঙ্গে বসবাস শুরু করা তরুণ-তরুণীদের BMI তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে।
গবেষণায় পুরুষদের ক্ষেত্রেও বিয়ের সঙ্গে ওজন বা BMI বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।





























