বিদেশে উচ্চশিক্ষা: স্বপ্নপূরণের লড়াই নাকি এক অনন্ত সংগ্রাম?
- আপডেট সময় : ০৩:৪০:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে বসবাসরত এক শ্রীলঙ্কান শিক্ষার্থীর জীবন যেন আজকের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীজীবনের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। পড়াশোনার পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, ক্লিনিং কোম্পানি এবং উবার ডেলিভারির কাজ করে রাতদিন পার করা এই তরুণ কাজ করতে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলার পর চাকরি হারিয়েছেন। দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স করতে আসা এই শিক্ষার্থীর ডিগ্রি অর্জনে প্রায় এক কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা। অথচ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাকে যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই একই রকম। বিদেশে আত্মীয়স্বজন ছাড়া বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ না থাকায় পড়াশোনার চেয়ে টিকে থাকাই অনেকের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার এই সিদ্ধান্তকে সাধারণত 'পুশ' ও 'পুল' ফ্যাক্টরের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। পুশ ফ্যাক্টরের মধ্যে রয়েছে দেশের বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। অন্যদিকে, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণার সুযোগ ও জীবনযাত্রার মান হলো পুল ফ্যাক্টর। তবে ব্রনফেনব্রেনারের সামাজিক পরিবেশতত্ত্ব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি পরিবার, অর্থনীতি, সমাজ ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার এক সম্মিলিত প্রভাব।
বাংলাদেশে অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিকল্পনাহীন সম্প্রসারণ, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোর অভাব এবং গবেষণার সুযোগ না থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা সেশনজট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। কর্মসংস্থানের অভাব তাদের বিদেশমুখী করে তোলে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন এক বিশাল অর্থনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত দেশগুলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে বিপুল আয় করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের দক্ষ কর্মশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে নীতি পরিবর্তনের প্রথম বলি হন এই শিক্ষার্থীরাই।
বিদেশে পৌঁছানোর পর শুরু হয় টিকে থাকার যুদ্ধ। টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা একাধিক শারীরিক পরিশ্রমে বাধ্য হন, ফলে পড়াশোনা গৌণ হয়ে পড়ে। পাশাপাশি অভিবাসনবিরোধী বিতর্ক ও জেনোফোবিয়ার কারণে ভিসা ও স্থায়ী হওয়ার অনিশ্চয়তা তাদের তাড়া করে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে কিছু অসাধু এজেন্সির প্রতারণা, যারা বিদেশে সহজ জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
মূল প্রশ্নটি হলো, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের বাজার কি তরুণদের মেধার ন্যায্য মূল্যায়ন করতে পারছে? এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে বিদেশ যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কমবে না। কিন্তু বিদেশও কোনো স্বপ্নের স্বর্গ নয়। এই দ্বিমুখী বাস্তবতার শিকার হয়ে অনেক তরুণ হতাশা, মানসিক সংকট এমনকি আত্মহননের পথও বেছে নিচ্ছেন। একটি দেশের মেধাবী তরুণদের স্বপ্নভঙ্গ কেবল ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার অপমৃত্যু।





























