উপসাগরীয় অবকাঠামোয় ইরানের নির্ভুল হামলা: বিপর্যস্ত জ্বালানি ও বিশ্ব অর্থনীতি
- আপডেট সময় : ০৭:০৬:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

ইরানের সামরিক শক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভিযান শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেশটির টিকে থাকা কঠিন করে তোলা। তবে যুদ্ধের সাত মাসের মাথায় এসে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় ভিন্ন হিসাব ফুটে উঠেছে। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, বিমান চলাচল ও ডিজিটাল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে এমন সব কৌশলগত আঘাত হেনেছে, যার জের ধরে পুরো বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাই সংকটে পড়েছে।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান ও তার মিত্রবাহিনী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও ইরাকে অন্তত ৮৪টি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ১৩৫টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার প্রধান কৌশল ছিল গোটা স্থাপনা গুঁড়িয়ে না দিয়ে কেবল এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও সংযোগ পয়েন্টে আঘাত হানা, যা অচল হলে পুরো কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিপক্ষের সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি অর্থনীতির জীবনরেখাকে থমকে দেওয়াই এই কৌশলগত যুদ্ধের মূল লক্ষ্য।
তেল পরিবহনে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরকে বারবার নিশানায় পরিণত করা হয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার ও রয়টার্সের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর ফুজাইরায় অন্তত ১৯ বার হামলা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে তেল টার্মিনাল থেকে জাহাজে তেল সরবরাহের ৬২টি পাইপলাইনের সংযোগস্থল ‘ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ড’ ক্ষতিগ্রস্ত হয় মার্চ মাসের হামলায়। এরপর ৪ মে পাইপলাইনে পুনরায় হামলায় পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি প্রায় এক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় থেকে ১ জুন পর্যন্ত বন্দরটি থেকে মাত্র একটি জাহাজ পণ্য নিয়ে বের হতে পেরেছিল এবং রপ্তানি স্বাভাবিক হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লেগে যায়। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রামানান কৃষ্ণমূর্তি মন্তব্য করেন, পাইপলাইন সংযোগে এই ক্ষতি কেবল কোনো ধ্বংসাবশেষ এসে পড়ার কারণে হওয়া অসম্ভব; এটি যেন সরাসরি কোনো ব্যবস্থার মূল কেন্দ্রে বা মস্তিষ্কে আঘাত হানা।
উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ এসব ক্ষয়ক্ষতির জন্য গুলি করে ভূপাতিত করা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করলেও রয়টার্সের পর্যালোচনা করা উপগ্রহচিত্র, ছবি এবং ১৪ জন শিল্প বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মত তা খারিজ করে দেয়। তাদের মতে, দুর্ঘটনাবশত ধ্বংসাবশেষ পড়ে টানা এতগুলো কৌশলগত যন্ত্রাংশ অচল হওয়া গাণিতিকভাবে অসম্ভাব্য।
গ্যাস ও শিল্প খাতের ক্ষেত্রেও ক্ষতির পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি। বিশ্বের ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহকারী কাতারের রাস লাফান প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনায় হামলায় গ্যাস তরলীকরণের প্রধান দুটি ‘কোল্ড বক্স’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্চে কাতার এনার্জির প্রধান সাদ আল-কাবি রয়টার্সকে জানান, এসব যন্ত্রপাতি পুরোপুরি মেরামত করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে আবুধাবির আল তাওয়েলাহ অ্যালুমিনিয়াম কারখানার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গলিত অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন অংশে হামলায় ১,২৬২টি স্মেল্টিং সেল বন্ধ হয়ে যায়। দুই মাস পর প্রথম সেলটি চালু করা গেলেও আগস্টের শেষ পর্যন্ত মাত্র এক-চতুর্থাংশ সচল করা সম্ভব হয়। পুরো উৎপাদন স্বাভাবিক হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যালুমিনিয়ামের দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্স ও কাতারের পার্ল গ্যাস-টু-লিকুইডস শোধনাগারের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে ফেরাতেও এক বছর বা তার বেশি সময় লাগবে।
মরুভূমির দেশগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগে আঘাত হেনে মানবিক সংকট তৈরির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। কুয়েতের প্রায় ৯০ শতাংশ পানীয় জল আসে সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র থেকে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাথে যুক্ত। রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২ মার্চ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে কুয়েতের আটটি যৌথ বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারের অন্তত চারটিতে হামলা চালানো হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ইউটার মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো সতর্ক করে বলেছেন, পানিশোধন কেন্দ্র অচল হয়ে পড়লে কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে পানির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
পরিবহন ও ডিজিটাল তথ্য অবকাঠামোও রেহাই পায়নি। কুয়েতের বিমানবন্দরে ৮ বার হামলা ছাড়াও বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অবস্থিত অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারে হামলা হওয়ায় প্রযুক্তি সেবায় অচলাবস্থা তৈরি হয়; যেখানে বাহরাইনের কেন্দ্রটি ৬ মাস পরও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি।
সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় জাজান শোধনাগারে ২৫ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্তত চারবার হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা, যার ফলে শোধনাগারটির উৎপাদন শূন্যে নেমে আসে। যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবের নয়টি প্রধান শোধনাগারের পাঁচটি এবং তিনটি মূল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময়ে সৌদির দৈনিক তেল উৎপাদন পূর্বের ১ কোটি ব্যারেলে থেকে কমে ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে যায়, যার আর্থিক ক্ষতি ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ১০ সেপ্টেম্বর মরুভূমির তিনটি পাম্পিং স্টেশনে হামলায় পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হামলা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি। সাবেক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা ও বিমান হামলা সমন্বয়কারী রায়ান স্টিভেনস রয়টার্সকে জানান, ইরানের নিশানার নির্ভুলতা, ধৈর্য ও দক্ষতার পরিচয় স্পষ্ট। এই গোয়েন্দা তথ্যের পেছনে রাশিয়া, চীন বা স্থানীয় সূত্রের সহায়তা থাকতে পারে বলে মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের ধারণা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব ও আমিরাত হামলার ছবি ও ভিডিও প্রচারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও কেবল অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে সুনির্দিষ্ট আঘাত হেনে কীভাবে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যুদ্ধের এই নতুন কৌশল বিশ্বকে তা নতুন করে ভাবাচ্ছে।




























