হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের এশীয় বন্ধুদের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
- আপডেট সময় : ০৫:৫২:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে

আগস্টের ৩০ তারিখ থেকে টানা দুই সপ্তাহ ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। কিরগিজস্তানের বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন এবং এরপর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন—এই দুই মঞ্চে ইরানের নেতারা এমন সব দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসবেন, যাদের তেহরানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রয়োজন রয়েছে। এই বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। তবে কোন শর্তে এই জলপথ উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগে ২০২৫ সালে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দুই কোটি ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল চলাচল করত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক চীন ও ভারত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তাদের তেলের ৪৪ শতাংশ সংগ্রহ করত। এছাড়া জাপান তাদের আমদানিকৃত তেলের ৯৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৭০ শতাংশ এই পথেই পেত। এলএনজি, সার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানির ওপরও এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। এর ফলে প্রণালি বন্ধ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
ওয়াশিংটন গত কয়েক মাসে শক্তি প্রদর্শন, অবরোধ এবং আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। চীন ও ভারতসহ অন্যান্য দেশ নীরব কূটনীতির মাধ্যমে ইরানকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, কারণ জ্বালানি ও পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং কৌশলগত মজুত হ্রাসে তাদের উদ্বেগের কারণ বাড়ছে। তবে ইরানের এশীয় বন্ধুদের ঐক্য খুব একটা মজবুত নয়। চীনের কাছে প্রায় ১৪০ দিনের কৌশলগত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং তারা রাশিয়া থেকে তেল কিনছে। এছাড়া চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল কমেছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার জন্য হরমুজ সংকট অনেকটা 'অর্থনৈতিক উপহার' হিসেবে কাজ করেছে, কারণ এশিয়ার ক্রেতারা রাশিয়ার তেলের দিকে ঝুঁকেছে এবং এতে মস্কো আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৯০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয় করেছে। চ্যাথাম হাউসের এক গবেষণায় এই পরিস্থিতিকে পুতিনের জন্য অর্থনৈতিক উপহার বলা হয়েছে।
ভারতের জন্য হরমুজ খোলা রাখা সবচেয়ে জরুরি। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৫৬ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে এবং তাদের বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজির ৯০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে আসে। প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর জাহাজ চলাচল ১৩০-১৪০টি থেকে কমে এক অঙ্কে নেমেছে। ২০২৬ সালের জুনে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকের বেশি এসেছে রাশিয়া থেকে। তবে চীন, ভারত বা রাশিয়ার কেউই যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানকে হরমুজ খুলতে বাধ্য করার মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই।
এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কিছুটা আশার আলো দেখালেও, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের মার্কিন দাবি এবং হরমুজ খোলার বিষয়ে মূল অচলাবস্থা কাটেনি। ১৯৭৯ সালের পর প্রথম সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হলেও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি। চীনের মধ্যস্থতারও সীমা আছে; মার্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প সহায়তা চাইলেও বেইজিং সাড়া দেয়নি। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালেন কার্লসনের মতে, চীন এই সংকটকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সমস্যা হিসেবে দেখে।
বিশকেক ও নয়াদিল্লির সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সরাসরি বিকল্প না হলেও, এটি চীন ও ভারতকে উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানানোর সুযোগ করে দেবে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান যেমন হেনরি কিসিঞ্জারকে বেইজিং নিয়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিবর্তন এনেছিল, বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও পর্দার আড়ালের কূটনীতি বা গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খোঁজা প্রয়োজন। এটি কোনো শান্তিচুক্তি না হলেও উত্তেজনা কমানোর একটি কাঠামো হতে পারে, যা বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বার্থ রক্ষার জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকসের ঐকমত্যভিত্তিক ব্যবস্থায় যৌথ ঘোষণা কঠিন, তাই আসল কূটনীতি হতে হবে সম্মেলনের আড়ালে।




























