বুদ্ধিজীবী ও স্বৈরাচারের সখ্য: ক্ষমতার মোহে সততার বিসর্জন

- আপডেট সময় : ১২:৫২:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

আলতাফ হোসেন জন্মগতভাবে সিলেটের বাসিন্দা হলেও বিশ্বাসে ছিলেন পাকিস্তানপন্থী। সামরিক একনায়ক আইয়ুব খানের আমলে ডন পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তার প্রধান দায়িত্ব ছিল বাঙালিদের পাকিস্তানি ও মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলা। এই কাজে তিনি এতটাই সফল ছিলেন যে আইয়ুব খান তাকে মন্ত্রিসভায় স্থান করে দেন। আলতাফ হোসেন কেবল একজন নন; ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে আমরা প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ খুব কমই পেয়েছি। কর্তৃত্ববাদী শাসনের এই দীর্ঘ যাত্রায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ বিভিন্ন অজুহাতে স্বৈরাচারী সরকারের পাশে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। কেউ ধর্মের নামে, কেউ ভারতবিরোধিতার নামে, আবার কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা উন্নয়নের দোহাই দিয়ে স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বনের যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছেন।
বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁদের প্রধান কাজ ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য তৈরি করা নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে অনবরত আঘাত করা। কিন্তু তারা ঠিক তার উল্টোটি করেছেন। নিজের পক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই বুদ্ধিজীবীর সততার প্রকৃত পরীক্ষা, যেখানে বাংলাদেশের আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের কথা বলা যায়, যিনি ১৯৭১ সালের গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও পাকিস্তানের অখণ্ডতার নামে সেই বর্বরতাকে মেনে নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালানোর পরপরই তিনি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ‘পতন’ হিসেবে দেখেছিলেন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাজকে জাতীয় সংহতি রক্ষার বয়ান তৈরি করেছিলেন।
ইতিহাসে বিভিন্ন সময় একদল বুদ্ধিজীবী পৈশাচিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিতে মুখিয়ে থেকেছেন। আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর প্রিজন নোটবুকস-এ বুদ্ধিজীবীদের এই দুষ্কর্মের কথা উল্লেখ করেছিলেন। নোয়াম চমস্কির তত্ত্বে যাকে ‘সম্মতি নির্মাণ’ বা ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট বলা হয়, বুদ্ধিজীবীরা সেই মতাদর্শের মই ব্যবহার করে ক্ষমতার ওকালতি করেন। স্তালিন, হিটলার, আইয়ুব বা হাসিনার মতো স্বৈরশাসকদের টিকে থাকার জন্য এসব বুদ্ধিজীবী জ্বালানির মতো জরুরি। জর্জ অরওয়েল দেখিয়েছেন, কীভাবে রাজনৈতিক ভাষার কারসাজিতে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করা যায়। খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবীরা যখন দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকের পক্ষে কলম ধরেন, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে ঠান্ডা মাথার গুম-খুনও পার পেয়ে যায়।
বাংলাদেশেও একদল বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের প্রতি সমর্থনের নামে আওয়ামী স্বৈরতন্ত্রের সহযোগী হয়ে উঠেছিলেন। হাসিনার শাসনামলে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন, ভোটাধিকার হরণ ও বাক্স্বাধীনতা সংকোচনের মতো বিষয়গুলো তারা আদর্শগত কারণে প্রয়োজনীয় মনে করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে তারা কেবল একাত্তরের ইতিহাস সংরক্ষণ, মৌলবাদের বিরোধিতা ও অসাম্প্রদায়িকতাকে বুঝিয়েছেন, কিন্তু আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও বৈষম্যহীন সমাজের মতো বিষয়গুলো উপেক্ষা করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ছাত্র ও জনতা নিহত হচ্ছিল, তখন প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা গণভবনে গিয়ে হাসিনার গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছিলেন।
সোভিয়েত আমলে নিকোলাই বুখারিন বা জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের মতো বুদ্ধিজীবীরাও স্বৈরশাসনের প্রতি সমর্থন ত্যাগ করেননি। তারা বিশ্বাস করতেন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বা জাতির শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার স্বার্থে স্তালিন বা হিটলারের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশেও বুদ্ধিজীবীরা একইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে মিলিয়ে একটি অভিন্ন নৈতিক সত্তা নির্মাণে সহায়তা করেছেন। এই স্ববিরোধিতা জেনেও বছরের পর বছর ধরে একই মন্ত্রের পুনরাবৃত্তি করতে করতে তারা স্বৈরাচারের লেজুড়ে পরিণত হয়েছেন, যা তাঁদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে বড় ব্যর্থতা।




























