ঢাকা ০৮:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তজুমদ্দিনে মাদরাসা ভাঙচুর ও প্রধান শিক্ষককে হয়রানির প্রতিবাদে মানববন্ধন সোনাদিয়া চ্যানেলে জলদস্যুদের তাণ্ডব, আহত ৮ মাঝিমাল্লা চমেক হাসপাতালে চরফ্যাশন আইনজীবী সমিতির এপিপি হিরনের সদস্যপদ ফের স্থগিত পানির তীব্র সংকট: ২০৩০ সালের আগেই ফুরিয়ে যাবে কাবুলের জল! ইরানে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল ডেঙ্গুতে আরও ১০ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯৯৬ নতুন রোগী ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ ও সংঘাত, গ্রেপ্তার ৬ হাজার জুলাই যোদ্ধাদের সাংবিধানিক সুরক্ষা ও দায়মুক্তি নিশ্চিত করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের উপ-নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ, পুনর্নির্বাচনের দাবি বিরোধীদের সার্বিয়ার ভিসা দেওয়ার নামে ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র

উত্তরাঞ্চলে হৃদরোগ চিকিৎসায় ভরসা দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৮:০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা ও তুলনামূলক কম খরচের কারণে দিনাজপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। দিনাজপুর শহরের উপশহর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রোডে অবস্থিত এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শুধু উত্তরাঞ্চলই নয়, নিয়মিত সেবা নিতে আসছেন দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রান্তের রোগীরা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এই সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত রবীন্দ্রনাথ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। পূর্বপরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সে বছরের ডিসেম্বরেই তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য বলেন, "এখন বেশ ভালো আছি। হাসপাতালের বিল পরিশোধের সময় বিশেষ ছাড় দিয়েছিল আমাকে। এই হাসপাতালের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।"

হাসপাতালটিতে হৃদযন্ত্রে রিং পরানো, পেসমেকার স্থাপন ও ওপেন হার্ট সার্জারির পাশাপাশি নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জারি, জেনারেল সার্জারি, অর্থোপেডিক সার্জারি, গলব্লাডার অস্ত্রোপচার, ক্যানসার চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিস, গাইনি ও অবস, ফিজিওথেরাপি এবং দাঁতের চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, ইকো, ইটিটি ও সিটি স্ক্যানের আধুনিক সুবিধা।

বর্তমানে ৩৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন রোগী চিকিৎসা নেন, যাঁদের সিংহভাগই হৃদরোগী। এছাড়া হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ভর্তি থাকেন শতাধিক রোগী, যার মধ্যে গড়ে ৩০ জন হৃদরোগী। জরুরি বিভাগেও প্রতিদিন অর্ধশতাধিক মানুষ সেবা পান এবং দৈনিক গড়ে ১৫টির বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৩০২ জন জনবলের মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার ও নার্স রয়েছেন ১৫২ জন এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আছেন ১৫০ জন। একটি দক্ষ ২১ সদস্যবিশিষ্ট কার্যনির্বাহী কমিটির মাধ্যমে হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় বোন ও সাবেক মন্ত্রী মরহুমা বেগম খুরশিদ জাহান হক অসংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে ১৯৯২ সালে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৯৯৩ সালে দিনাজপুর শহরের মুন্সিপাড়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হলেও পরের বছরই হাউজিং এস্টেট এলাকায় নিজস্ব জমি কিনে ভবন নির্মাণ করা হয়। প্রথমে ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা করা এই অলাভজনক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটি পরে ১০০ শয্যা এবং বর্তমানে ৩৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে।

একই চত্বরে এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে গড়ে উঠেছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ২৫০ শয্যার কেয়ার স্পেশালাইজড জেনারেল হাসপাতাল এবং দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ। এছাড়া সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে মোজাম্মেল হক ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস এবং খুরশিদ জাহান হক ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতাল। দেশে-বিদেশে দক্ষ চিকিৎসাকর্মী তৈরির লক্ষ্যে বর্তমানে প্রস্তাবিত ইম্পেরিয়াল মেডিকেল কলেজ ও প্রস্তাবিত কেয়ার মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলছে।

প্রতিষ্ঠানটির গোড়াপত্তন থেকে যুক্ত রয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী মোকাররম হোসেন। শুরুতে পিয়ন হিসেবে যোগ দিলেও দক্ষতা বাড়িয়ে বর্তমানে তিনি এক্স-রে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন। শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে মোকাররম হোসেন বলেন, "অনেক মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও সহযোগিতার ফসল আজকের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল। গ্রামে গ্রামে লিফলেট বিলি করেছি আমরা। ভবন নির্মাণের সময় কেউ সিমেন্ট দিয়েছে, কেউ রড, কেউ দিয়েছে ইট। যে কিছুই দিতে পারেনি, সে এসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছে।" তাঁর দুই মেয়েও এই প্রতিষ্ঠানটির নার্সিং কলেজ থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে বর্তমানে এখানেই নার্স হিসেবে কর্মরত আছেন।

দরিদ্র ও অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালটি বিশেষ ছাড়ের পাশাপাশি ২০১০ সালে গঠিত একটি জাকাত ফান্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি ও প্রবাসীদের সহায়তায় এই তহবিল পরিচালিত হয়। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার আতাপুর গ্রামের বর্গাচাষি এমদাদুল হক গত ৬ আগস্ট বুকে ব্যথা নিয়ে এখানে ভর্তি হন। হৃদযন্ত্রে দুটি ব্লক ধরা পড়লে তাঁর শরীরে রিং পরানো হয়। চার দিন পর তাঁর মোট বিল আসে ৭৫ হাজার ৪০০ টাকা, যা পরিশোধ করা তাঁর পরিবারের পক্ষে অসম্ভব ছিল। পরে হাসপাতালের জাকাত ফান্ড থেকে তাঁকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

এমদাদুলের শ্যালক ফেরদৌস বলেন, "আমরা খুবই খুশি হয়েছি। রোগী এখন ভালো আছে। হাসপাতাল থেকেই আর্থিক সহায়তা পেয়েছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সবাই খুব আন্তরিক ছিলেন। ডাক্তার সাহেবও অনেক সময় দিয়েছেন আমাদের।" হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সামশির করিম জানান, জাকাত ফান্ড চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার রোগীকে ৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে ৩২৭ জন রোগীকে এই তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা এ খাতে ব্যয় হয়।

নার্সিং শিক্ষার প্রসারে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজে বর্তমানে বিএসসি নার্সিং (বেসিক), বিএসসি নার্সিং (পোস্ট বেসিক), ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্স চালু রয়েছে। সম্প্রতি এখানে এমএসসি ইন নার্সিংয়ের দুটি কোর্স চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কলেজের সচিব শাহজাহান আলী জানান, এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী এখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশ-বিদেশে কর্মরত আছেন। এই কলেজের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রদীপ কুমার রায় বর্তমানে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত। তিনি বলেন, "তখন অনেকটা না বুঝেই নার্সিং পড়তে গিয়েছিলাম। এখন বুঝি, কত ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নার্স ও মিডওয়াইফারি হিসেবে কাজ করছেন।"

বিগত দিনে রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি অনুদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আজাদ বলেন, "প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় অবহেলিত ছিল। ২০০৬ সালের পর থেকে প্রায় ১৭ বছর প্রতিষ্ঠানটি সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। এ সময়ে স্থানীয় মানুষের অনুদান ও সহযোগিতায় সেবা কার্যক্রম চলেছে।" তবে সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সাধারণ সম্পাদক আরও জানান, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা আরও সম্প্রসারণে বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার সুফল আগামীতে উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশের রোগীরা ভোগ করতে পারবেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

উত্তরাঞ্চলে হৃদরোগ চিকিৎসায় ভরসা দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন

আপডেট সময় : ০৮:০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা ও তুলনামূলক কম খরচের কারণে দিনাজপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। দিনাজপুর শহরের উপশহর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রোডে অবস্থিত এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শুধু উত্তরাঞ্চলই নয়, নিয়মিত সেবা নিতে আসছেন দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রান্তের রোগীরা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এই সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত রবীন্দ্রনাথ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। পূর্বপরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সে বছরের ডিসেম্বরেই তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য বলেন, "এখন বেশ ভালো আছি। হাসপাতালের বিল পরিশোধের সময় বিশেষ ছাড় দিয়েছিল আমাকে। এই হাসপাতালের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।"

হাসপাতালটিতে হৃদযন্ত্রে রিং পরানো, পেসমেকার স্থাপন ও ওপেন হার্ট সার্জারির পাশাপাশি নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জারি, জেনারেল সার্জারি, অর্থোপেডিক সার্জারি, গলব্লাডার অস্ত্রোপচার, ক্যানসার চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিস, গাইনি ও অবস, ফিজিওথেরাপি এবং দাঁতের চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, ইকো, ইটিটি ও সিটি স্ক্যানের আধুনিক সুবিধা।

বর্তমানে ৩৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন রোগী চিকিৎসা নেন, যাঁদের সিংহভাগই হৃদরোগী। এছাড়া হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ভর্তি থাকেন শতাধিক রোগী, যার মধ্যে গড়ে ৩০ জন হৃদরোগী। জরুরি বিভাগেও প্রতিদিন অর্ধশতাধিক মানুষ সেবা পান এবং দৈনিক গড়ে ১৫টির বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৩০২ জন জনবলের মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার ও নার্স রয়েছেন ১৫২ জন এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আছেন ১৫০ জন। একটি দক্ষ ২১ সদস্যবিশিষ্ট কার্যনির্বাহী কমিটির মাধ্যমে হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় বোন ও সাবেক মন্ত্রী মরহুমা বেগম খুরশিদ জাহান হক অসংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে ১৯৯২ সালে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৯৯৩ সালে দিনাজপুর শহরের মুন্সিপাড়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হলেও পরের বছরই হাউজিং এস্টেট এলাকায় নিজস্ব জমি কিনে ভবন নির্মাণ করা হয়। প্রথমে ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা করা এই অলাভজনক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটি পরে ১০০ শয্যা এবং বর্তমানে ৩৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে।

একই চত্বরে এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে গড়ে উঠেছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ২৫০ শয্যার কেয়ার স্পেশালাইজড জেনারেল হাসপাতাল এবং দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ। এছাড়া সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে মোজাম্মেল হক ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস এবং খুরশিদ জাহান হক ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতাল। দেশে-বিদেশে দক্ষ চিকিৎসাকর্মী তৈরির লক্ষ্যে বর্তমানে প্রস্তাবিত ইম্পেরিয়াল মেডিকেল কলেজ ও প্রস্তাবিত কেয়ার মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলছে।

প্রতিষ্ঠানটির গোড়াপত্তন থেকে যুক্ত রয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী মোকাররম হোসেন। শুরুতে পিয়ন হিসেবে যোগ দিলেও দক্ষতা বাড়িয়ে বর্তমানে তিনি এক্স-রে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন। শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে মোকাররম হোসেন বলেন, "অনেক মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও সহযোগিতার ফসল আজকের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল। গ্রামে গ্রামে লিফলেট বিলি করেছি আমরা। ভবন নির্মাণের সময় কেউ সিমেন্ট দিয়েছে, কেউ রড, কেউ দিয়েছে ইট। যে কিছুই দিতে পারেনি, সে এসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছে।" তাঁর দুই মেয়েও এই প্রতিষ্ঠানটির নার্সিং কলেজ থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে বর্তমানে এখানেই নার্স হিসেবে কর্মরত আছেন।

দরিদ্র ও অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালটি বিশেষ ছাড়ের পাশাপাশি ২০১০ সালে গঠিত একটি জাকাত ফান্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি ও প্রবাসীদের সহায়তায় এই তহবিল পরিচালিত হয়। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার আতাপুর গ্রামের বর্গাচাষি এমদাদুল হক গত ৬ আগস্ট বুকে ব্যথা নিয়ে এখানে ভর্তি হন। হৃদযন্ত্রে দুটি ব্লক ধরা পড়লে তাঁর শরীরে রিং পরানো হয়। চার দিন পর তাঁর মোট বিল আসে ৭৫ হাজার ৪০০ টাকা, যা পরিশোধ করা তাঁর পরিবারের পক্ষে অসম্ভব ছিল। পরে হাসপাতালের জাকাত ফান্ড থেকে তাঁকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

এমদাদুলের শ্যালক ফেরদৌস বলেন, "আমরা খুবই খুশি হয়েছি। রোগী এখন ভালো আছে। হাসপাতাল থেকেই আর্থিক সহায়তা পেয়েছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সবাই খুব আন্তরিক ছিলেন। ডাক্তার সাহেবও অনেক সময় দিয়েছেন আমাদের।" হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সামশির করিম জানান, জাকাত ফান্ড চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার রোগীকে ৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে ৩২৭ জন রোগীকে এই তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা এ খাতে ব্যয় হয়।

নার্সিং শিক্ষার প্রসারে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজে বর্তমানে বিএসসি নার্সিং (বেসিক), বিএসসি নার্সিং (পোস্ট বেসিক), ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্স চালু রয়েছে। সম্প্রতি এখানে এমএসসি ইন নার্সিংয়ের দুটি কোর্স চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কলেজের সচিব শাহজাহান আলী জানান, এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী এখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশ-বিদেশে কর্মরত আছেন। এই কলেজের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রদীপ কুমার রায় বর্তমানে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত। তিনি বলেন, "তখন অনেকটা না বুঝেই নার্সিং পড়তে গিয়েছিলাম। এখন বুঝি, কত ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নার্স ও মিডওয়াইফারি হিসেবে কাজ করছেন।"

বিগত দিনে রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি অনুদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আজাদ বলেন, "প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় অবহেলিত ছিল। ২০০৬ সালের পর থেকে প্রায় ১৭ বছর প্রতিষ্ঠানটি সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। এ সময়ে স্থানীয় মানুষের অনুদান ও সহযোগিতায় সেবা কার্যক্রম চলেছে।" তবে সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সাধারণ সম্পাদক আরও জানান, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা আরও সম্প্রসারণে বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার সুফল আগামীতে উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশের রোগীরা ভোগ করতে পারবেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh