রাশিয়ায় কাজের কথা বলে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল মামুনকে, ড্রোন হামলায় মৃত্যু
- আপডেট সময় : ০৭:৩৯:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

সংসারের অভাব দূর করতে এবং ভাগ্য বদলাতে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে চলতি বছরের ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন ময়মনসিংহের আল মামুন (২৪)। ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে এখন শুধুই লাশ ফেরত পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছে তাঁর পরিবার। রাশিয়ায় কাজের কথা বলে নিয়ে গিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার। নিহত মামুন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে। দেশে তিনি ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করতেন। বাড়িতে স্ত্রী, এক ছেলে ও পাঁচ মাসের কন্যাসন্তান রেখে তিনি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন গত মঙ্গলবার মামুনের পরিবারকে এই মৃত্যুর খবর জানান। এর আগে যুদ্ধে আহত হয়ে রাশিয়া থেকে পালিয়ে গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন রাজন। তাঁর দাবি, তাঁদের সঙ্গে একই ফ্লাইটে যাওয়া ৩০ জন বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ১৭ জন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
মামুনের স্ত্রী মহিমা আক্তার জানান, তাঁর স্বামীকে ইলেকট্রিকের কাজের কথা বলেই রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল, তিনি যুদ্ধ করতে যাননি। দালালেরা প্রতারণা করে মামুনসহ একই দলের ৩০ বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। রাশিয়া যাওয়ার পর থেকে স্বামীর সঙ্গে মহিমার সরাসরি যোগাযোগ কম হতো, তবে মামুন অডিও বার্তা ও ছবি পাঠিয়ে যোগাযোগ রাখতেন। সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট একটি অডিও বার্তা পাঠানোর পর মামুনের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। মহিমা বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার সময় মামুন তাঁর কাছে ভয় ও শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন। মামুন বলেছিলেন, তাঁর মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে এবং কখন কী ঘটে বলা যায় না। সন্তানদের দেখে রাখার কথাও বলেছিলেন তিনি। মহিমা আক্ষেপ করে বলেন, তাঁর স্বামীই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ঋণ শোধ করে বাড়িতে একটি ঘর করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন। এখন দুই সন্তান নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।
মামুনকে রাশিয়ায় পাঠাতে পরিবারের প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে স্বজনেরা জানান। এই বিপুল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়, ধানের ওপর প্রায় ৪ লাখ টাকা দাদন নেওয়া হয় এবং বাকি টাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে ও ঘরের গরু বিক্রি করে জোগাড় করা হয়েছিল। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে মা রোকেয়া খাতুন এখন দিশেহারা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, একমাত্র ছেলেকে ভাগ্য বদলাতে সাড়ে আট লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এখন ছেলেই নেই, অথচ রয়ে গেছে ঋণের বিশাল বোঝা। নাতি-নাতনিদের কীভাবে বড় করবেন, তা তিনি জানেন না। ছেলের মৃত্যুর সঠিক সময়, স্থান কিংবা মরদেহ কোথায় আছে—সে সম্পর্কে পরিবারের কাছে কোনো তথ্য নেই। রাশিয়ায় পাঠানো দালালদের বিচার দাবি করে রোকেয়া খাতুন সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
রাশিয়া থেকে আহত অবস্থায় ফিরে আসা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের রাজন হোসেন জানান, 'জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড' নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ৭ মে একই ফ্লাইটে ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। সবারই ভিসা, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) কার্ড ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছিল। ৮ মে তাঁরা রাশিয়ায় পৌঁছান এবং কয়েক দিন পর ১২ মে ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ড ও কাজের অনুমতিপত্র দেওয়ার কথা বলে তাঁদের একটি চুক্তিতে সই করানো হয়। চুক্তিটি রুশ ভাষায় লেখা থাকায় তাঁরা কিছুই বুঝতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, সেটি ছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি। এরপর তাঁদের একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং ১২ জুন যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। ১৪ জুন ড্রোন হামলা ও মাইন বিস্ফোরণে ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন। ওই দিন মাথায় ড্রোন ও বোমার বিস্ফোরণে রাজনও আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি ১৮ আগস্ট পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে যান এবং রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতায় ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন। রাজন জানান, ৩০ বাংলাদেশির জন্য একজন রুশভাষী কমান্ডার দোভাষী হিসেবে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই তিনি গত সোমবার মামুনের মৃত্যুর খবর পান এবং পরিবারকে জানান।
মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তাঁর খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার। তিনি জানান, প্রায় দুই বছর আগে মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন পর 'জাবাল-এ নূর' এজেন্সির মাধ্যমে তাঁর ভিসা হয়। রাশিয়ায় যাওয়ার পর রুশ ভাষায় চুক্তিতে সই নেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তাঁরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছিলেন। সেখান থেকে তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না। তাঁরা বারবার বিভিন্ন দপ্তরে এবং থানায় মামলা করার জন্য যোগাযোগ করলেও কেবল আশ্বাসই পেয়েছেন। কোবিলা আক্তার 'জাবাল-এ নূর' এজেন্সির প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, ৩০ বাংলাদেশিকে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত জানান, মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি তাঁর পরিবার মৌখিকভাবে জানিয়েছে। পরিবারকে একটি লিখিত আবেদন দিতে বলা হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।





























