গ্যাসের হাহাকারে বিপর্যস্ত জনজীবন, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং
- আপডেট সময় : ০৭:২৯:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

সারা দেশে গ্যাসের জন্য নজিরবিহীন হাহাকার চলছে। গ্যাস সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং, যার ফলে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবনে নাভিশ্বাস অবস্থা তৈরি হয়েছে। শিল্পকারখানা ও সার কারখানাগুলোতেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হলেও তা চাহিদার তুলনায় ৬০ শতাংশ কম। ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে গ্যাসের অভাবে অর্ধেকের বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন উৎপাদনে নেই। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সার কারখানাগুলোতে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস। রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসেরও তেমন চাপ নেই, ফলে চুলা না জ্বলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই পরিস্থিতির জন্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাট ও ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশার দৌরাত্ম্যকে দায়ী করেছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার কারণে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মধ্যরাতে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার সময় বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়।
চলমান সমস্যা সমাধানে সরকার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ, এখন দেশে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং আমদানি করা এলএনজিও জাতীয় গ্রিডে দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে আরও তিনটি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১০-১২ দিন আগে একটি টার্মিনালের জন্য অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং মোংলা-হিরণ পয়েন্ট এলাকায় আরও একটি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালগুলো মেরামতের কাজও চলছে। এ পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। গত বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করেও এ খাত থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে আগে তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হতো। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লোডশেডিং দূর করতে সরকার শিল্পকারখানায় গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করছে, তবুও বৃহস্পতিবার চাহিদার তুলনায় ৩,৫০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ ভাগ কারখানা থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। গাজীপুরের একটি নিট কারখানায় আগে দিনে ২৬ টন কাপড় উৎপাদন হলেও গ্যাস সংকটে তা কমে সাড়ে ১১ থেকে ১২ টনে নেমে এসেছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গ্যাস না থাকায় দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল) দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ব্যাংকঋণের সুদ ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যার ফলে প্রতি মাসে ১০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে।
গ্যাস উত্তোলনে শীর্ষে থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও রান্নার চুলা জ্বলছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। জেলা শহরে গ্যাস না পেয়ে বাসাবাড়িতে মাটির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। টেংকের পাড় এলাকার বাসিন্দা রুনা দাস ও রানী দাস জানান, বেলা ১১টার পর গ্যাস থাকে না, তাই লাকড়ি সংগ্রহ করে মাটির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। কাজীপাড়ার ইয়াদে রিবা পাপিয়া জানান, দুই দিন ধরে গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডার গ্যাস কিনে রান্না করতে হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় যানবাহন চালকরা দুর্ভোগে পড়েছেন।
কুমিল্লা নগরীর অধিকাংশ এলাকাও টানা দুই দিন ধরে গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না। বাগিচাগাঁও এলাকার সাখাওয়াত হোসেন জানান, ৩১ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গ্যাস নেই। রেসকোর্স এলাকার খালেদা আক্তার জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় বাড়ির পাশে অস্থায়ী চুলা বানিয়ে রান্না করতে হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের জনজীবনও বিদ্যুৎ সংকটে অতিষ্ঠ। গ্রামে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৭ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। ছাতকের জাউয়াবাজার এলাকায় বিদ্যুতের দাবিতে মিছিল হয়েছে। তাহিরপুরের মশিউর রহমান জানান, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে ছেলেমেয়েরা ঘুমাতে পারছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকলেও মাস শেষে পুরো বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।



























